৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতার ভাষণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা তখন সময়ের দাবি। ২৬ মার্চ আসল কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা। দেশ স্বাধীন হল মৌখিকভাবে। তারপর, বুলেট-আগুন-চিত্কার-রক্ত-লাশ-বিজয়। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে স্বাধীনতা অর্জন, দীর্ঘ নয় মাস।
উত্তাল ৭১ থেকে আজ ২০১৫, মাঝখানে পার হয়েছে চুয়াল্লিশটি বছর। চুয়াল্লিশ বছর বয়স্ক একটি দেশের কেমন হওয়া উচিত? সেই দেশের নাগরিকদের নিশ্চয় মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়ে বেড়ানো উচিত। সেই দেশে নিশ্চয় কাউকে কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে হয় না। কেউ কারো দ্বারা শোষিত হই না। সেখানে জীবনের নিরাপত্তা বিশ্বমানের। দারিদ্র্য শব্দটা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে সেই স্বাধীন দেশটিতে। পেট্রোল বোমার আঘাতে মারা যায় না কোন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। হত্যা-গুম-অন্যায়-অবিচার, এসব তালা বন্দি থাকবে সে দেশে। চির শান্তির সেই দেশে দুর্নীতিবাজদের কোন ঠাই নেই। সেই দেশে কেউ সত্য কথা বলতে ভয় পায় না। প্রতিটা মানুষ স্বাধীনতার চেতনা নিজেদের ভিতরে ধারণ করে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে।
বাংলাদেশের সব থেকে আশাবাদী মানুষটাও এই স্বপ্নগুলো দেখার কথা ভাববেন না। কিন্তু এই স্বপ্নগুলো কোনভাবেই অযৌক্তিক নয়। একজন স্বাধীন নাগরিক নিজের দেশকে নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখতেই পারেন। এটা তার রাষ্ট্রীয় অধিকার।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সূচনা। তার হাত ধরে আজকে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের একটি দেশ থেকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। প্রযুক্তির উত্কর্ষতা সাধন এখন সর্বাধিক পর্যায়ে। প্রতিযোগিতামূলক লেখাপড়া প্রতি নিয়ত বের করে আনছে মেধাবী মুখ। চিকিত্সা, শিল্প ও বাণিজ্য, কৃষি, যোগাযোগ, ক্রীড়া সর্ব ক্ষেত্রে আমাদের আগ্রযাত্রা চোখে পড়ার মতন। তবু ক্ষুদ্র কিছু অভাব আজো সিন্দাবাদের বুড়োর মতন ভর করে আছে আমাদের উপর। অভাবটা দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসার, দায়িত্ববোধ এবং সম্মানবোধের। কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই শিক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। এই শিক্ষা সম্পূর্ণ নিজের বিবেকের। একটু যদি নিজের বিবেকটা ঠিক করতে পারি রুপকথার বাংলাদেশ পাওয়াটা অসম্ভব নয়।
খাবার টেবিলে আমরা স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে ঝড় তুলি। দিনশেষে সেই ঝড়ের অবসান ঘটে টয়লেট ফ্লাশে। স্বাধীনতার চেতনা নামক বুলি চুয়াল্লিশ বছর আগেকার। এই নিয়ে মাতামাতি করে ২০১৫ সালে কোন লাভ নেই। আমাদের এখন নতুন চেতনা দরকার। প্রতিটা মানুষের ঘরে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দেবার চেতনা। স্বাধীনতাকে রক্ষা করার চেতনা দরকার।
সময়টা সামনে তাকানোর। অতীত বোকাদের আশ্রয় স্থল। আর ভবিষ্যতের চিন্তা করে বুদ্ধিমানেরা। এক সময় কাগজে কলমে বাংলাদেশের চির শত্রু ছিল পাকিস্তান। সময়ের আবর্তে শাসক বদলিয়েছে, শোষিতরা বদলায়নি। তিলে তিলে আমরা নিজেরা নিজেদের শত্রুতে পরিণত হয়েছি। আগে পাকিস্তানিরা আমাদের নির্বিচারে হত্যা করত, এখন আমরা আমাদের হত্যা করি। তাহলে আমাদের আর পাক-হানাদারদের ভিতরে পার্থক্য থাকছে বলে মনে হয় না।
মাঝে মাঝে তাই প্রশ্ন জাগে, যদি স্বাধীনতার রুপ এতটা হিংস্র হয় তাহলে আজও কি স্বাধীন আমরা হয়েছি? কিংবা ত্রিশ লক্ষ রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি সেটা আমাদের প্রাপ্য ছিল কিনা? তাই, চুয়াল্লিশ বছর আগে কে আমাদের শত্রু ছিল সেটা না ভেবে আমাদের উচিত হবে আগামী চুয়াল্লিশ বছর পর আমরা নিজেরা নিজেদের ধ্বংস করে দিব কিনা সেটা ভাববার। আমরা যদি নিজেদের ভিতরের সংঘাত বন্ধ করতে না পারি, তাহলে দেশের সকল প্রাপ্তিগুলো অপ্রাপ্তির খাতাতে মুখলুকোবে।
রুপকথার বাংলাদেশ অনেক দূরে নয়। হাতের কাছে। আমি আর আপনিই পারব রুপকথার বাংলাদেশ গড়তে। প্রয়োজন একটু সত্ সাহস দেখানোর। কিছুটা দায়িত্ববোধ নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার। আর কিছুটা সম্মান আর ভালোবাসা আমাদের দেশের জন্য। দেশতো বদলাবেই, মানুষগুলোও বদলাবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ভূ-তাত্ত্বিক বিজ্ঞান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Email:ariawsat¦gmail.com
