দেশের মোট শিল্প উদ্যোক্তার মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি নারী। তারা বুটিক, পার্লারের মতো ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করে চামড়া, হিমাগার, আইটিসহ নানামুখী ব্যবসায়িক উদ্যোগেও রয়েছে তাদের পথচলা। জানাচ্ছেন মোহাম্মদ ওমর ফারুক
ছোট বা মাঝারি যে কোনো শিল্পেই নারী উদ্যোক্তাদের মুখোমুখি হতে হয় নানা ধরনের প্রতিকূলতার। মূলধনের সঙ্কট থেকে শুরু করে পারিবারিক বাধাসহ নানা সমস্যা তো রয়েছেই। কিন্তু সব কিছু পিছনের ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। নারী তাদের কর্মসংস্থানে বিভিন্ন খাতে সংযুক্ত হচ্ছে। বর্তমানে কৃষি খাত ছাড়াও তৈরি পোশাক খাতেও রয়েছে তাদের বিশাল অবদান। এরই মধ্যে নারী উদ্যোক্তারা সংগঠিত হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিডব্লিউসিসিআই) নারী উদ্যোক্তা গঠনে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে চাপ প্রয়োগ করছেন। এছাড়া নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে এরই মধ্যে সরকারিভাবে গঠিত হয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন, বিসিক ও মহিলা অধিদফতর। তাছাড়া অর্থায়নের কাজে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এ উদ্যোগের সঙ্গে আরো যেসব প্রতিষ্ঠানকে সংযুক্ত করেছে, তার মধ্যে ডিসিসিআই, এফবিসিসিআই, বিডব্লিউসিসিআই, ডব্লিউইএবি, সিডব্লি উসিসিআই। সামগ্রিকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রচার বা প্রচারণায় ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও তাদের ক্ষমতায়নে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ২০১৪ সালে প্রায় ৪১ হাজার নারী উদ্যোক্তাকে ঋণও দেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোক্তা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি স্বল্প সুদে ঋণ পেয়েছেন। এছাড়া গত কয়েক বছরে দেশে তৈরি হয়েছে সফল নারী উদ্যোক্তা, যারা এরই মধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন করেছেন। শুধু তাই নয় নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জয়িতা নামে একটি প্রকল্পও রয়েছে। তাছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইউনিট গঠন করা হয়েছে। যা নারী উদ্যোক্তাদের অনেক বড় পাওয়া এমনটাই মনে করেন নারী উদ্যোক্তারা।
দিন পাল্টাচ্ছে। কর্মজীবনের সব সেক্টরেই বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। কয়েকবছর আগেও বাংলাদেশে কম্পিউটার তথা আইসিটি ক্ষেত্রে একচেটিয়া পুরষদেরই বিচরণ ছিল। কারণ যারা শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসায় নিয়োজিত তাদের বেশিরভাগই ছিল পুরুষের অংশগ্রহণ। গত কয়েক বছরে এ চিত্র ধীরে ধীরে পাল্টে গেছে। এ খাতে এখন নারীরাও অনেক দূর এগিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশে আইসিটি খাতে নারীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে। এগুলোতে সরাসরি বাংলাদেশের মহিলাদের ভাগ্যোন্নয়নে বা উদ্যোক্তা হতে আইসিটিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় মহিলা সংস্থার একটি প্রকল্পের নাম ‘জেলাভিত্তিক মহিলা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ’। ১৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষিত মহিলাদের তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। এ প্রকল্পে, জেলাভিত্তিক মহিলা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ (২য় পর্যায়) প্রকল্পটি ২০১১ এর জুলাই থেকে জুন বাস্তবায়ন করা হয়। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল— শিক্ষিত মহিলাদের প্রযুক্তি নির্ভর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করাসহ শিক্ষিত নারী সমাজের দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়তা করা, শিক্ষিত বেকার মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা, নারী সমাজকে মানব সম্পদে পরিণত করার লক্ষ্যে উত্সাহ জোগানো ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে সর্বত্তম প্রচেষ্টা নেয়া। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, বগুড়া, ফরিদপুর, দিনাজপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রংপুর, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, পাবনা, কুড়িগ্রাম, নাটোর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, নেত্রকোনা, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, নওগাঁ, গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ভোলা, গাজীপুর, পঞ্চগড়, ও কক্সবাজার জেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এছাড়া জাতীয় মহিলা সংস্থা তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের কাজ করেন। এ প্রকল্পের নাম হচ্ছে ‘তথ্য আপা’। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন প্রকল্প নাম দেয়া হয়েছে ‘তথ্য আপা’।
দেশের ১০টি উপজেলায় কিছুসংখ্যক নারীকে নির্বাচিত করা হয়। ‘তথ্য আপা’ প্রযুক্তির অধীনে একটি নারীর জন্য ডিজিটাল তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয় এবং গ্রাম ও শহরের সব নারী সেই ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার পান। আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন এবং ভবিষ্যতে আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি যত বেশি স্থিতিশীল হবে এবং আকার যত বাড়তে থাকবে, তত বেশি নারী উদ্যোক্তা এ সেক্টরে এগিয়ে আসবে। তাছাড়া তথ্য প্রযুক্তিকে পুঁজি করে বর্তমানে নারীরা সহজে উদ্যোক্তা হতে পারছে।
নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারিভাবে অনেক প্রকল্প আছে যে প্রকল্পগুলো নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ করে থাকে। তাছাড়া তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ব্যবস্থাও আছে। কয়েকদিন আগে সকল ব্যাংকে তাদের উন্নয়নের জন্য একটি উন্নয়ন কমিটির ব্যবস্থাও করেছে সরকার তাছাড়া সরকার প্রতি বছর নারী উন্নয়নের জন্য একশ’ কোটি টাকা বাজেট করে যা পুরোটাই নারী উন্নয়ের জন্য কাজে লাগিয়ে থাকে।
নারী উদ্যোক্তা অ্যাডকমের চেয়ারম্যান গীতিয়ারা সাফিয়া চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এখন একটি অসম্ভব কল্পনা। কিন্তু আমরা যদি সবাই উদ্যোক্তা হতে পারি, তবে বেকার সমস্যার সমাধান সম্ভব। যার যতটুকু পুঁজি আছে তা নিয়েই উদ্যোক্তা হওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘অনেকের ধারণা, ব্যবসা করতে অনেক টাকা লাগে। মোটেও তা নয়, ১০০ টাকা দিয়েও ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। কিন্তু কে জানে এ ১০০ টাকা পুঁজিই হয়তো তাকে ১০০ কোটি টাকার ব্যবসায়ীতে পরিণত করতে পারে।’
আরেকজন নারী উদ্যোক্তা টিম এনজিন এর সামিরা জোবেরী হিমীকা জানান, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার নানা সুবিধার ব্যবস্থা নিয়েছে কিন্তু অনেক সময় নারী উদ্যোক্তারা না জানার কারণে এসব সুবিধা থেকে যথারীতি বঞ্চিত হচ্ছে। তারপরেও অনেক নারী এই সুবিধাটি পাওয়ার কারণে আজ একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নাম লিখিয়েছে।
