খুলনার আবু নাসের হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গতা পায়নি পাঁচ বছরেও

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৫, ০১:০০

দীর্ঘ পাঁচ বছরেও পূর্ণাঙ্গতা পায়নি খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল। আড়াইশ’ শয্যার এ হাসপাতালটি বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে মাত্র চারটি বিভাগের ৭৫টি বেড নিয়ে। এর বাইরে রয়েছে মাত্র ২০টি ডায়ালাইসিস বেড। গত পাঁচ বছরে এ হাসপাতালের তিনজন পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু বদলায়নি এ হাসপাতালের ভাগ্য। অথচ এ হাসপাতালটি বর্তমান সরকারের একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে গড়ে উঠেছে।

হাসপাতালে রয়েছে তীব্র জনবল সঙ্কট। বর্তমানে ৪০২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৭৮ জন। এর মধ্যে আবার ১১৮ জনই ঠিকাদারের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত। সরকারের কাছ থেকে বেতন নিয়ে ওই ঠিকাদাররা কর্মচারীদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে তাদের মধ্যে তা বিতরণ করেন। আর কম বেতনে কর্মরত এসব কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে বৈষম্যের হতাশা। তাছাড়া কোন কারণে ঠিকাদার পরিবর্তন হলে চাকরি হারাতে হতে পারে, এমন আশঙ্কাও রয়েছে অনেকের মধ্যে।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, তিন বছরেও ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজ শেষ হয়নি। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে এ দৃশ্য দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে কার্ডিওলজি (হার্ট), নেফ্রোলজি (কিডনি), নিউরোলজি ও ইউরোলজি- এ চারটি বিভাগে রোগী ভর্তি করার পাশাপাশি বহির্বিভাগেও দেখা হচ্ছে নিউরো সার্জারি, অর্থপেডিক্স সার্জারি এবং দন্ত বিভাগের রোগী। ভর্তি রোগীদের মধ্যে কিডনি বিভাগের সিডিউল রোগীদের প্রতিদিন ২০ জনকে হোমো-ডায়ালাইসিস মেশিনে ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে। তবে গত ২ মার্চের এক আদেশে এ হাসপাতালের একমাত্র কনসালটেন্টকে কক্সবাজারে বদলি করায় কিডনি বিভাগটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নতুন করে কোন কনসালটেন্ট পদায়ন না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে অন্যত্র বদলির বিষয়টি নিয়ে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
একই সাথে এ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. আবু বকরকে অন্যত্র বদলি করায় কিডনির ডায়ালাইসিস রোগীদের আরো বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। সূত্রমতে, খুলনার একমাত্র ওই চিকিত্সকই  ডায়ালাইসিসের জন্য রোগীদের ‘ফিস্টুলা’ করাতে পারদর্শী। তার বদলির কারণে রোগীদের এখন ঢাকামুখী হতে হচ্ছে। আর ঢাকা থেকে ফিস্টুলা করায় রোগীদের কোন সমস্যা হলে পুনরায় সেখানে যেতে হয়। ফলে রোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
খুলনা নাগরিক ফোরামের চেয়ারপার্সন মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, বিকল্প কনসালটেন্ট পদায়ন না থাকলে খুলনার কিডনি রোগীদের দুর্ভোগের অন্ত থাকবে না। খুলনাবাসীর অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষার হাসপাতাল এটি। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরেও হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করতে পারেনি। সাধারণ ডাক্তার দিয়ে ভাল চিকিত্সা আশা করা যায় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ মোশাররফ হোসেন বলেন, আবু নাসের হাসপাতালটি বর্তমান সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। চারদলীয় জোট সরকার যেখানে এর নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখেছিল সেখানে এ হাসপাতালটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা উচিত ছিল।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. বিধান চন্দ্র গোস্বামী বলেন, হাসপাতালের মূল সমস্যাই হচ্ছে জনবল সঙ্কট। আইসিইউ প্রস্তুত থাকলেও যেমন জনবলের অভাবে তা চালু করা যাচ্ছে না, তেমনি নিউরোসার্জারি, বাইপাস সার্জারি, অর্থোপেডিক্স সার্জারি, প্লাস্টিক সার্জারি এবং বার্ন ইউনিটও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি সঙ্কট রয়েছে মেডিক্যাল অফিসারের। ২৭ জনের স্থলে বর্তমানে মাত্র ৪ জন মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে হাসপাতালটি চালানো হচ্ছে। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখা হয়েছে। মৌখিকভাবেও বলা হচ্ছে।

১৯৯৮ সালে তত্কালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে খুলনা শহীদ শেখ আবু নাসের হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালে অর্থ সঙ্কট দেখিয়ে এর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। দীর্ঘ চার বছর পর ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুনরায় এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০১০ সালের ৩০ মার্চ আংশিকভাবে চালু হয় এটি।