১৪ নম্বর লালখান বাজার। মাদক ব্যবসার আখড়া আর পাহাড়ের পাদদেশে গড়েওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বর্ষাকালে বেড়ে যায় জীবনের ঝুঁকি। এ দুই সমস্যায় জর্জরিত নগরীর অন্যতম লালখান বাজার ওয়ার্ড। এলাকাবাসীর অভিযোগ এ সমস্যাগুলোর পেছনে জড়িত স্থানীয় একটি স্বার্থান্বেষী মহল। অসহায় দরিদ্র মানুষগুলোকে মাদক ও পাহাড়ি জমি দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে তারা। এলাকাবাসীর অভিযোগ এ সব অপরাধ দমনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা বারবার দায়সারা ভাব। শুধু তাই নয়, এসব বস্তির ভোটার নির্বাচনে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রায় তিন বর্গমাইল আয়তনের লালখান বাজার ওয়ার্ড। পাহাড়ের পাশে অবস্থিত ওয়ার্ডটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকার ভূমি রেলওয়ে, ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের। সরকারি এ সব পাহাড়ি জমিকে গ্রাস করতে বসেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। গড়ে তুলেছে অসংখ্য বস্তি। নিম্নআয়ের মানুষদের ভাড়া দিয়ে প্রচুর টাকা আয় করছে ভূমিদস্যুরা। বস্তিগুলোকে মাদক ব্যবসার নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধির অভিযোগ—মাদক ব্যবসার সাথে জড়িতদের তালিকা তৈরি করে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ রয়েছে এই ওয়ার্ডে। ভোটার রয়েছে ৪৪ হাজার ৮৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৩ হাজার ৮৮০ ও নারী ভোটার ২০ হাজার ৯০২ জন। মোট ভোটারের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার বস্তির ভোটার।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়—ওয়ার্ড এলাকায় ছয়টি বড় আকারের বস্তি রয়েছে। রেলওয়ে, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার পাহাড়ি জায়গায় এসব বস্তি গড়ে উঠেছে। অবৈধভাবে গড়েওঠা এ সব বস্তিতে বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির সংযোগও রয়েছে। পানির সুবিধার জন্য গভীর নলকূপও বসিয়ে দিয়েছে জনপ্রতিনিধিরা। সরকারি এ সব জমিতে দ্বিতল, তিনতলা বিল্ডিং নির্মিত হয়েছে। কেউ বাধা দিচ্ছে না। পাহাড়ে পাদদেশে অবস্থিত বসতিগুলো বর্ষা মৌসুমে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কয়েকবার উচ্ছেদও করা হয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালীরা পুনরায় তাদের বসিয়ে দিচ্ছে।
জানা যায়—শুধু মতিঝর্ণা বস্তিতেই সাড়ে ১০ হাজার ভোটার রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ—মাদক ব্যবসার সাথে এলাকার ৬০-৭০ জন নারী জড়িত রয়েছেন।
এবার নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন ৫ জন। এদের মধ্যে ৩ জন আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং ২ জন বিএনপি সমর্থক। বিএনপি সমর্থক তৌহিদ আজিজ ও আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কারণে একাধিক মামলা রয়েছে। প্রকাশ্যে তারা এলাকায় চলাফেরা করতে পারছে না। অন্যরা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।
এলাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল। এলাকায় সিটি করপোরেশন পরিচালিত একটি দাতব্য চিকিত্সালয় ও মমতা ক্লিনিক নামের দুটি চিকিত্সা কেন্দ্র রয়েছে, যা এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা রয়েছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও আর্থিক অস্বচ্ছলতার অভাবে নিম্ন-আয়ের মানুষের ছেলে-মেয়েরা এ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে না। উঁচু পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট রয়েছে। এলাকার রাস্তা-ঘাটের অবস্থা অনেকাংশে উন্নত। নালা-নর্দমা অপরিচ্ছনতা ও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকে অলি-গলির প্রবেশ মুখে। জনবল সংকটে এ সব কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জানান।
এলাকার বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে বর্তমান কাউন্সিলর এএফ কবির আহমদ মানিক বলেন—এলাকায় পানি সংকট সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। মাদক ব্যবসা ও সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপন এসব সমস্যার সাথে এলাকার কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সরাসরি জড়িত। মাদক ব্যবসার কারণে এলাকায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিস্তার ঘটছে। ভূমিদস্যুরা সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রাখতে ভাসমান লোকদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন—রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমিগুলো বনায়ন করে রক্ষা করা সম্ভব। উচ্চ শিক্ষার জন্য এলাকার দুটি মাধ্যমিক স্কুলকে কলেজে উন্নীত করা যেতে পারে।
নির্বাচনী মাঠে তত্পরতা চালাচ্ছে স্থানীয় যুবলীগ নেতা সহিদুল ইসলাম শামীম। তিনি এবার কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি বলেন—এলাকায় বিগত সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। একটি স্বার্থান্বেষী মহল জায়গা জমি দখল করে ব্যবসা ও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের আর্থিক ফায়দা হাসিল করছে। এবার নির্বাচনে এলাকাবাসী যদি আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন তাহলে লালখান বাজার ওয়ার্ডকে দলমতের উর্ধ্বে উঠে একটি ‘মডেল ওয়ার্ডে’ রূপান্তর ও ন্যায়ভিত্তিক আদর্শ সমাজ গঠনের প্রচেষ্টা চালাবো।
