প্রতিবন্ধীরা সমাজেরই অংশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব প্রতিবন্ধীর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে তাদের প্রতি আরো সহানুভূতিশীল হতে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিবন্ধীরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তারা আমাদের সম্পদ, বোঝা নয়। এসব প্রতিবন্ধীর প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হলে তারা তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে সমাজে ব্যাপক অবদান রাখতে পারবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা কেউ তাদের অবহেলার চোখে দেখবেন না। বরং আরো সহানুভূতি ও ভালোবাসা দিয়ে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করবেন।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ৮ম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী এতে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ন্যাশনাল অটিজম এডভাইজরি কমিটির চেয়ারপার্সন সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের একটি ভিডিও বার্তা অনুষ্ঠানে প্রচার করা হয়। অন্যান্যের মধ্যে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট প্রমোদ মানকিন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ড. মোজাম্মেল হোসেন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম কিংবা প্রতিবন্ধিত্ব কোন রোগ নয় বরং এটি একটি সৃষ্টি-বৈচিত্র্য। আমাদের সমাজে অটিজম নিয়ে কিছু নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। আমাদের এ ধরনের নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হলে তারাও হতে পারে সমাজের মূল্যবান সম্পদ। এসময় তিনি উদাহরণ হিসাবে আইনস্টাইন, ডারউইন, নিউটন, ইয়েটস ও স্টিফেন হকিংয়ের মতো বিখ্যাত অটিস্টিক ব্যক্তিত্বদের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সুস্থ মানুষের মতো প্রতিবন্ধীরাও এখন দক্ষতা প্রদর্শন করতে সমর্থ হচ্ছে এবং তাদের অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারছে। প্রধানমন্ত্রী অটিস্টিক শিশুদের উপযোগী হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও ওয়েবসাইট তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে ইতিমধ্যে ‘ডিজ্যাবল পারসন্স রাইট এ্যান্ড প্রটেকশন এ্যাক্ট-২০১৩’ এবং ‘নিউরো-ডেভলপমেন্টাল ডিজ্যাবল প্রটেকশন ট্রাস্ট এ্যাক্ট-২০১৩’ প্রণয়ন করেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি ও চিকিত্সা প্রদানে ৬৪টি জেলায় ১০৩টি সেবা ও সহায়তা কেন্দ্র (ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার) চালু করেছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল উপজেলায় এ সেবা ছড়িয়ে দেয়া হবে। তিনি প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি চাকরির কোটা সংরক্ষণ ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা বৃত্তি চালুসহ তাদের কল্যাণে নেয়া সরকারের অন্যান্য পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এজন্যে একটি বিশেষ সমন্বিত শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এ নীতির আওতায় প্রায় ১০ হাজার মানসিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষার জন্য ৫০টি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে প্রায় সাড়ে নয় কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশেষ একাডেমি স্থাপনের কাজ শুরু করেছে সরকার।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় শারীরিক প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের সাফল্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা প্যারা অলিম্পিক এবং স্পেশাল অলিম্পিকে বেশ কয়েকবার বিরল পুরস্কার অর্জন করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এজন্য প্রতিবন্ধীদের খেলাধুলার বিস্তার ঘটাতে আমরা একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছি।
শেখ হাসিনা আরো বলেন, আমার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন একজন অটিজম বিশেষজ্ঞ ও শিশু মনোবিজ্ঞানী। দেশের মানুষ অটিজম সম্পর্কে সামান্যই সচেতন ছিলেন। কিন্তু আমার মেয়ে এ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে একটি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তার কাছ থেকে অটিজম সম্পর্কে জেনেছেন এবং শিখেছেন উল্লেখ করে তিনি সায়মা ওয়াজেদকে ধন্যবাদ জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী অটিস্টিক শিশুদের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।