বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকে টানা অবরোধের ৮৭তম দিন ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। অবরোধের আগুনে (পেট্রোল বোমায়) এ পর্যন্ত সারাদেশে ৭৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। পঙ্গু হয়ে দিনযাপনও করছেন অনেকে। নিহতদের পরিবারের অবস্থা আরো নাজুক। দেখা গেছে, যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রায় সবাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
অবরোধের আগুনে দগ্ধদের বেশিরভাগের শেষ আশ্রয়স্থল হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট। চলমান সহিংসতায় পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে চিকিত্সা নিতে আসা ব্যক্তিদের ২২ জন মারা গেছেন। জেলা প্রশাসন থেকে লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকার অনুদান দেয়া হলেও পরে এসব পরিবারের খোঁজ নেয়নি কেউ। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে সংসার চালাতে গিয়ে অন্ধকার দেখছে এসব পরিবার। তবে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা ঘোষণার পর আশার আলো দেখতে শুরু করছে তারা।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক (৩) ডা. মো. জুলফিকার আলী লেনিন বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন অবস্থায় যে ২২ জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে দুইজনকে জীবিত থাকা অবস্থায় ১০ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, হাত খরচ, ওষুধের খরচ ছাড়াও এ পর্যন্ত ৮৪ জনকে ১০ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে। তবে এদের মধ্যে যারা মারা গেছেন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাদের পরিবারের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য পাওয়ার পর মারা যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তানদের মধ্যে ১০ লাখ টাকা ভাগ করে দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তির পর ১১ জানুয়ারি মারা যান মাগুরার ট্রাক হেলপার মুরাদ। ১৪ জানুয়ারি মারা যান রংপুরের বৃদ্ধা তাসিরান। ১৫ জানুয়ারি মারা যান বরিশালের আবুল কালাম। ২৩ জানুয়ারি মারা যান সাভারের জাকির হোসেন ও বগুড়ার আবদুর রশিদ। ২৭ জানুয়ারি মারা যান সিলেটের বকুল দেবনাথ। ১ ফেব্রুয়ারি নাটোরের নূর আলম, ২ ফেব্রুয়ারি ভোলার আব্দুল ওয়াহিদ, ৪ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, ১৯ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরের হোসেন মিয়া, ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের মো: জাহিদ, ২২ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনার বাপ্পি, ২৭ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার জাহাঙ্গীর ও নারায়ণগঞ্জের শাকিল, ৮ মার্চ চট্টগ্রামের সুভাস সৌম, ২১ মার্চ কুমিল্লার মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ খান, ২২ মার্চ মাগুরার শাকিল আহমেদ, মতিন বিশ্বাস ও যশোরের শরীফ, ২৫ মার্চ যশোরের ইয়াদুল ও খোরশেদ, মাগুরার ইমরান মারা যান।
এদের মধ্যে মৃত্যুর পরও জাকির হোসেনের পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, নিহতদের কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এদের কেউ ছিলেন ট্রাকের হেলপার, কেউ ছিলেন ট্রাক বা বাসের চালক। কেউ ছিলেন ব্যবসায়ী, কেউবা রাখাল।
অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহতদের বেশ কয়েকজন স্বজনের সঙ্গে গতকাল কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নিহত খোরশেদের স্ত্রী আয়শা খাতুন বলেন, ‘আমাদের খবর কেউ রাখেনি। অনেক কষ্টে দিন কাটছে। আমার স্বামী ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। খেয়ে না খেয়ে জীবন পার করছি।’
নিহত ইমরান মোল্লার স্ত্রী লাভলী আক্তার বলেন, ‘বার্ন ইউনিটে আনার পর অনেকেই বলেছেন আমার স্বামী আর বাঁচবেন না। তবু আমি আশা ছাড়িনি। কিন্তু সে আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। লাভলী জানান, চার বছর আগে ইমরান মোল্লার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকেই তারা সপরিবারে থাকছেন মাগুরা সদরের মিরপাড়ার ভাড়া বাসায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখার আর কেউ রইলো না।’
মাগুরার ইয়াদুলের দুলাভাই (ফুফাতো বোনের জামাই) আবদুল জলিল জানান, ইয়াদুলের মা ছাড়া কেউ নেই। বাবা মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অন্ধকার দেখছেন এই বৃদ্ধা। ইয়াদুল মারা যাওয়ার পর লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এছাড়া আর কোন অনুদান পাননি।
শাকিল আহমেদের বাবা বলেন, ‘আমার মনি কইছিল টাহা জমায়ে এটটা নসিমন কিনতি পারলি আমাগের আর অভাব থাকপিনানে। ইট কিনে ঘর দেবো। তহন আর তোমাগের কাম করতি হবেন না। তোমরা তহন বসে খাতি পারবা। ছেলে নাই এখন আমাগো খাওয়াও নাই।’
মতিন বিশ্বাসের স্ত্রী বলেন, ‘খুব সকালে বার হইতো সে। বালির কাজ করে দিনি ৩০০ টাকা পাইত। তাই দিয়েই কষ্টে সংসার চলতো। এখন আমার সব শেষ। কীভাবে আমরা বাঁচপো?’ বলেই কেঁদে দিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০ দলীয় জোটের অবরোধ ও হরতাল সহিংসতায় বোমা-হামলায় দগ্ধদের প্রত্যেককে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন ৬৩ জন দগ্ধ নারী-পুরুষকে এ অর্থ দেয়ার জন্য বিবেচনা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে যাছাই বাছাই শেষে বোমা হামলায় দগ্ধদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র হিসেবে এই টাকা দেয়া হয়। পারিবারিক সঞ্চয়পত্র সরকারি কোষাগারে রেখে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা করে ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে দেয়া হবে। অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তির অবর্তমানে তার পরিবার এ অর্থ ভোগ করবেন।