রাজশাহী শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ফ্লাইং ক্লাবের প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার তিন দিনেও দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তবে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বেসামরিক বিত্মান চলাচল কর্তৃপক্ষের ফ্লাইট সেফটি শাখার পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন নাজমুল আনামের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে।
বুধবার দুপুর ২টার দিকে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির প্রশিক্ষণ বিমান সেসনা ১৫২ শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। ভূমি থেকে ৬শ’ ফুট উচ্চতায় গেলে এর ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। পরে এর প্রশিক্ষক লে. কর্নেল (অব.) সাঈদ কামাল বিমানটি জরুরি অবতরণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সাথে সাথে এটি বিধ্বস্ত হয়ে ভূমিতে এসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় ওই বিমানের প্রশিক্ষণার্থী তামান্না রহমান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। প্রশিক্ষক সাঈদ কামাল এখন সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, দুই বছর আগে বেসরকারি খাতে বাংলাদেশ এভিয়েশন লিমিটেড নামক একটি ফ্লাইং ক্লাব চালু হয়। তারা বৈমানিক প্রশিক্ষণের জন্য এই প্রশিক্ষণ বিমানটি সংগ্রহ করে। কিন্তু এ ফ্লাইং ক্লাবটি সম্প্রতি আর্থিক সংকটে পড়ে। কয়েকমাস আগে তারা এই সেসনা ১৫২ বিমানটি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিকে লিজ দেয়।
বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত একজন সিনিয়র পাইলট গতকাল ইত্তেফাককে জানান, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সেসনা ১৫২ প্রশিক্ষণ বিমানটি দুই দশকেরও বেশি সময়ের পুরনো। পুরনো অবস্থায় এটি কেনা হয়েছিল। বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অলাভজনক সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ফ্লাইং একাডেমি এই সেসনা বিমান দিয়ে বৈমানিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হতো না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিবিসি জানায়, বাংলাদেশে বিমান দুর্ঘটনায় একজন শিক্ষানবিশ পাইলটের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ করছে নিহতের পরিবার। বুধবারের ঐ দুর্ঘটনায় শিক্ষানবিশ বৈমানিক তামান্না রহমান নিহত হন, তবে স্থানীয়দের তত্পরতায় প্রশিক্ষক বেঁচে গেছেন। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির কর্মকর্তারা বলছেন, সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেখেই তারা বিমান চালনার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।
গত ১ এপ্রিল রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে তামান্না রহমান ও তার প্রশিক্ষককে নিয়ে প্রশিক্ষণ বিমানটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যে জরুরি অবতরণের সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনা কবলিত বিমানটি থেকে প্রশিক্ষককে তাত্ক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে স্থানীয়রা। কিন্তু আগুনের কারণে তামান্না রহমানকে তারা উদ্ধার করতে পারেনি। বৃহস্পতিবার তামান্না রহমানের বাবা-মা অভিযোগ করেন বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির অনুপযুক্ত বিমান এবং প্রশিক্ষকের অবহেলার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির প্রধান ক্যাপ্টেন মফিদুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, বিমানের ব্যবস্থাপনাগত কোনো ত্রুটি থাকলে আমরা সেটি ওড়ার জন্য কোনো অনুমতি দেই না। এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ মনিটর করে থাকেন। বিমানগুলো শতভাগ রক্ষাবেক্ষণের মধ্যে থাকে। যান্ত্রিক কোনো ত্রুটি ছিল নাকি প্রশিক্ষকের কোনো ভুল ছিল তা তদন্তের আগে কিছুই বলা সম্ভব নয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বিমানটি দুর্ঘটনা কবলিত হওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর অগ্নিনির্বাপক গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স আসে। বিমানবন্দরের বাইরে থেকে এসে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশিক্ষককে উদ্ধার করেন। এ ক্ষেত্রে বিমানবন্দর কর্মীদের গাফিলতি ছিল বলেও মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে মফিদুল ইসলাম খান বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল। আমরা শুধু অপারেটর।
বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো বৈমানিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হলো বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি। ১৯৪৮ সাল থেকে এই একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে সাত শ’র বেশি পাইলট। প্রতি বছর গড়ে সাত থেকে আট জন বাণিজ্যিক বৈমানিক এখানে প্রশিক্ষণ নেন। বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন নাসিমুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলো নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন এবং বিমানবন্দরেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে। তবে নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা থাকেন তাদের অবহেলা থাকতে পারে। এটা প্রতিষ্ঠানের নয় বরং ব্যক্তির ব্যর্থতা থাকতে পারে। ফায়ার ব্রিগেডের দেরিতে আসার কথা বলা হচ্ছে, এমনটা হওয়ার কথা নয়।
তামান্না রহমানের প্রশিক্ষণে ব্যবহূত বিমানটির দুর্ঘটনার মূল কারণ প্রশিক্ষকের ভুল নাকি যান্ত্রিক গোলযোগ তা তদন্তের পরই জানা সম্ভব হবে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন যদি দুর্ঘটনার পর পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করতো তাহলে হয়তো তামান্না রহমানের জীবন বাঁচানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি হতো।
