রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে সম্প্রতি তারুণ্যের শক্তির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করা হইয়াছে। ‘অ্যাকটিভ সিটিজেন’ বা সক্রিয় নাগরিক সংক্রান্ত আলোচনায় বক্তারা বলিয়াছেন, তরুণরাই হইলো সক্রিয় নাগরিক। তাহারা বলিয়াছেন, তরুণরা সমাজ আলোকিত করিবে। সকল কাজে তরুণদের সম্মুখে নিয়া আসিতে হইবে। বিশ্বায়নের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে তারুণ্যের শক্তিই অগ্রণী। তারুণ্যের উদ্দীপনাই সুন্দর সমাজের চাবিকাঠি। বক্তাদের মতে, সমাজে সকলেরই কিছু দায়িত্ববোধ রহিয়াছে। সমাজে বাস করিতে হইলে একে অপরকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। সমাজের উন্নয়নে তরুণদের কাজ করিতে হইবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি গঠনমূলক সুন্দর সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে তরুণরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করিতে পারে।
তারুণ্যের কিছু ধর্ম রহিয়াছে। তাহারা অন্য বয়সীদের তুলনায় ন্যায়-অন্যায়ের প্রভেদ করিতে অধিক সক্ষম। তরুণদেরই থাকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করিবার স্পর্ধা। আবার এই তরুণরাই যখন বয়সী হইবেন, সংসারী হইবেন, ক্যারিয়ারের ব্যাপারে সচেতন হইবেন তখন তাহাদের কেউ কেউ আপোষকামী হইবেন, আত্মকেন্দ্রিক হইবেন, আবার সমাজের স্থিতাবস্থা বজায় রাখিবার জন্য অবদান রাখিবেন। সামাজিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক উদ্ভাবনীতে তরুণরাই অগ্রগামী। আপাত হতাশাগ্রস্ত একটি সমাজ তরুণদের উপরেই নির্ভর করিতে চাহে এই আশায় যে, তাহাদের হাতেই নূতন দিনের সূচনা হইবে। বাংলাদেশ যে অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষা ও বীরত্বের মধ্য দিয়া স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছে, তাহাতে তরুণদের অবদানই সর্বাধিক। প্রাণের মায়া তোয়াক্কা না করিয়া দেশমাতৃকার জন্য তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া না পড়িলে আমরা আজও হয়তো পরাধীন জাতি হিসাবেই থাকিয়া যাইতাম।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে যেই তিনটি খাত অবদান রাখিতেছে তাহার মধ্যে রহিয়াছে কৃষি, তৈরি পোশাক ও বৈদেশিক রেমিট্যান্সের প্রবাহ। বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পে তরুণীরা এবং তরুণ অভিবাসী শ্রমিকেরা অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে শ্রম বিক্রি করিয়া দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখিয়া চলিতেছে এবং যাহার ফলে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ হইবার স্বপ্ন দেখিতেছে। তৈরি পোশাক শিল্পে অত্যন্ত কম মজুরিতে যে পোশাক তৈরি করিতেছে, তাহাই লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কের সুপার মার্কেটে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ লইয়া উচ্চমূল্যে বিক্রয় হইতেছে। এইভাবে পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত হইতেছে বৈদেশিক মুদ্রা। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া কিংবা ইউরোপের নানান দেশে অভিবাসী শ্রমিকরা উদয়াস্ত হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটিয়া, টাকা জমাইয়া দেশে পাঠাইতেছে, তাহারই রেমিট্যান্স জমা হইয়া রাষ্ট্রীয় কোষাগার স্ফীত হইতেছে। এই কয়েকটি খাত ছাড়াও তরুণরাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের নানান উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছে, ইহার মাধ্যমে নিজেরা স্বাবলম্বী হইতেছে, পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখিতেছে। আবার মুক্তিযুদ্ধ সমাপ্ত হইবার চার দশক পরও যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয় নাই, তখন এই তরুণরাই শাহবাগে মিলিত হইয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সমাপ্ত করিবার বিষয়টি নিশ্চিত করিয়া চলিয়াছে।
তবে যেই সমাজে বৈষম্য প্রকট, সামাজিক ন্যায্যতা যেইখানে নিশ্চিত নহে, পঙ্কিল রাজনীতি যেইক্ষেত্রে অনেককিছু নিয়ন্ত্রণ করিয়া থাকে, সেই সমাজে তরুণরাই হয় বিভ্রান্ত। হত্যা-নির্যাতন, জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস, মাদকপাচার, এসিড নিক্ষেপ, যৌন নির্যাতন ইত্যাদি নানান অপরাধে তরুণরাই বেশিমাত্রায় জড়াইয়া পড়ে। তাই সব তরুণকে সঠিক পথে পরিচালনা করার বিষয়টি এখনকার অন্যতম চ্যালেঞ্জ। সব তরুণকে যদি ইতিবাচক, সৃজনশীল ও উন্নয়নমূলক নানান কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যায়, তবে আমাদের সমাজ পাল্টাইতে খুব বেশি সময় লাগিবে না। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল তাহা সহজে হইতে দিবে না। তাই যাহারা শুভবোধ লইয়া চিন্তা করিতে সক্ষম, যেইসব নীতিনির্ধারক তরুণদের সম্ভাবনায় আস্থাশীল, তাহাদের ভাবিতে হইবে কীভাবে সকল তরুণকে সমাজ পরিবর্তনের কার্যক্রমে যুক্ত করা যায়।
