আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা লইয়া কম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় নাই। কিন্তু তাহার পরও আমরা বাস্তবোচিত শিক্ষা হইতে যোজন পথ দূরে রহিয়াছি। শিক্ষার দুর্বল মানের কারণে বাংলাদেশের একজন শিশুর ১১ বত্সরের স্কুলজীবনের সাড়ে চারটি বত্সর নষ্ট হইয়া যায়। তাহারা ১১ বত্সরে শিখে মাত্র সাড়ে ছয় বছরের পাঠ্যক্রমের সমান! আবার দেশের পঞ্চম শ্রেণির প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর তিনজনই নিজেদের শ্রেণির উপযোগী সাধারণ মানের অঙ্ক কষিতে পারে না। এই তথ্য জানা গিয়াছে বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা প্রতিবেদন হইতে। বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট: লার্নিং টু রিয়ালাইজ এডুকেশনস প্রমিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার নেপথ্যে চারটি বড় কারণ চিহ্নিত করা হইয়াছে। তাহা হইল—শৈশব জীবনের মানোন্নয়নে কর্মসূচিগুলির দুর্বলতা, নিম্নমানের পাঠদান, দুর্বল স্কুল ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ কম।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে পরীক্ষানির্ভর। এক শিক্ষার্থীকে তাহার ১২ বত্সরের শিক্ষাজীবনে চারটি পাবলিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হইতে হয়। পরীক্ষায় অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীই সর্বাধিক নম্বর পাইয়া উত্তীর্ণ হইলেও পঠিত বিষয় সামান্য এদিক-ওদিক করিয়া প্রশ্ন করা হইলে বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। অর্থাত্ আমাদের পরীক্ষাপদ্ধতি সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি নিশ্চিত করিলেও জ্ঞানের গভীরতা তৈরিতে ব্যর্থ হইয়াছে। আমাদের পঠন-পাঠন শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন করিতে শেখায় না, তোতা পাখির মতো মুখস্থ করিয়া কেবল মানিয়া লইতে শেখায়। যাহার ফলে একজন শিক্ষার্থী তাহার পাঠ্যবইয়ের গভীরে প্রবেশ করিতে পারে না। মহাকবি মিল্টন বলিয়াছেন—‘দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নতি সাধনের নাম শিক্ষা।’ কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবতার সহিত সম্পর্কিত নহে। শিক্ষা এখানে একটি সার্টিফিকেট, অর্থ উপার্জনের মাধ্যম এবং সামাজিক স্বীকৃতির নাম। আমরা জানি, মানবসম্পদ হইতেছে একটি দেশের সবচাইতে বড় পুঁজি। একটি দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ হইলেও দেশটি সমৃদ্ধিশালী বা উন্নত নাও হইতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ রহিয়াছে—এমন কোনো সম্পদ নাই, যাহা সেই দেশে নাই। উদাহরণ হিসাবে আফ্রিকার কঙ্গো বা সুদানের কথা বলা যাইতে পারে। নাইজেরিয়া পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম তেল উত্পাদনকারী দেশ। অ্যাঙ্গোলাও তেলসমৃদ্ধ। কিন্তু দরিদ্র। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। কিন্তু দীর্ঘকাল সেই দেশগুলি বাস্তবোচিত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজস্ব মানবসম্পদ তৈরি করিতে পারে নাই বলিয়া তাহারা প্রাকৃতিক সম্পদানুযায়ী উন্নতির শিখরে পৌঁছাইতে পারে নাই। অথচ সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ের মতো দেশ দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাইয়া উন্নতির শিখরে উঠিয়াছে। আবার প্রাকৃতিক সম্পদের হাহাকার থাকিলেও কেবল অতি দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করিয়াই জাপান পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ উন্নত দেশে পরিণত হইয়াছে।
সুতরাং যথাযথ কর্মমুখী ও বাস্তবোচিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের বিকল্প নাই। আশার একটি দিক হইল, ১৯৯০ সালে আমাদের দেশে যেইখানে মাত্র ৬৬ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষায় নিবন্ধিত ছিল, দেড় দশকে তাহা বাড়িয়া ৯১ শতাংশ হইয়াছে। এখন প্রয়োজন এই সকল শিশুর যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
