অনিবন্ধিত কারখানা :দায় কাহার?

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ২১:১৯

কলকারখানায় নিরাপদ ও শোভন কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করিবার দায়িত্ব শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই)। এই প্রতিষ্ঠান শ্রম আইন ও বিধিমালা বাস্তবায়নসহ শিশুশ্রম নিরসন, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং মজুরি কাঠামো নিশ্চিত করিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) বিভিন্ন খাতের যেসব শিল্পকারখানা রহিয়াছে, তাহার ৯৫% এই প্রতিষ্ঠানের কোনো নিবন্ধনই গ্রহণ করে নাই। সমপ্রতি চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে বিপুল প্রাণহানির প্রেক্ষিতে এই এলাকার অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলির কমপ্লায়েন্স পরিস্থিতি ও অনুমোদন অবস্থা যাচাইয়ে ডিআইএফই নিজ উদ্যোগে তৃতীয় পক্ষের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি জরিপ কার্য পরিচালনা করিয়াছে। তাহাতে এই ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। সংগত কারণে প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, অনুমোদন ছাড়া এইসব প্রতিষ্ঠান কিভাবে গড়িয়া উঠিতেছে? যাহাদের ইহা দেখিবার কথা ছিল, তাহারা এতদিন তাহা হইলে কী করিয়াছেন? এইক্ষেত্রে তাহারা যে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়াছেন, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

যদি কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুমোদনই না থাকে, তাহা হইলে তাহার উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং কমপ্লায়েন্স পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করা কিভাবে সম্ভব হইবে? জরিপে বলা হইয়াছে, ডিএসসিসি এলাকায় বিভিন্ন ধরনের কারখানা রহিয়াছে মোট পাঁচ হাজার ৪৫৭টি। তন্মধ্যে ডিআইএফএ’র নিবন্ধন রহিয়াছে মাত্র ৩৫০টির মতো কারখানার। ইহা মোট কারখানার মাত্র পাঁচ ভাগ। ফলে তদারকির অভাবে এইসব কারখানার কর্মপরিবেশের পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান নিশ্চিত হইতেছে না। এইসব এলাকায় সবচাইতে বেশি রহিয়াছে পোশাক কারখানা যাহার সংখ্যা এক সহস্রাধিক। রহিয়াছে খাদ্য প্রস্তুতকারক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কাগজ ও কাগজের পণ্য তৈরি, বেসিক মেটাল, ফ্যাব্রিকেটেড মেটাল, ইলেকট্রিক্যাল ইকুইপমেন্ট, ফার্মাসিউটিক্যাল মেডিসিনাল, রিসাইক্লিং, হস্তশিল্প, কেমিক্যাল, বোটানিক্যাল এবং রাবার ও প্লাস্টিক প্রস্তুতকারী পণ্যসহ নানা ধরনের কারখানা। এইসব কারখানার কর্মপরিবেশের প্রতি এই কারণে নজর দেওয়া আবশ্যক যাহাতে সেইখানে অগ্নিকাণ্ডসহ কোনো দুর্ঘটনা ঘটিবার আশঙ্কা না থাকে। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এইজন্য নিবন্ধন নেওয়াটা সর্বাগ্রে জরুরি। আমাদের শ্রম আইনের ৩২৬ ধারা ও শ্রম বিধিমালার ৩৫৪ বিধি অনুযায়ী প্রত্যেক মালিক বা দখলদারকে কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, দোকান ও ঠিকাদারি সংস্থা রেজিস্ট্রেশন এবং লাইসেন্স মঞ্জুরির জন্য আবেদন করিতে হয়। এই আবেদন যাচাই-বাছাই করিয়া নিবন্ধন দেয় ডিআইএফই। সুতরাং ৯৫ ভাগ কারখানাকে নিবন্ধনের আওতায় আনিতে না পারিবার দায় শ্রম মন্ত্রণালয় এড়াইতে পারে না।

শুধু ঢাকা দক্ষিণ এলাকাই নহে, ঢাকা উত্তরসহ সারাদেশে কত শত যে অনিবন্ধিত কারখানা রহিয়াছে, তাহার কি কোনো সঠিক হিসাব আছে? ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একের পর এক কল-কারখানা গড়িয়া উঠিবে, ইহাই সকলের প্রত্যাশিত। কেননা শিল্পোন্নয়ন ছাড়া আসলে কোনো দেশের প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নহে। তবে এইসব কারখানার কর্মপরিবেশ ও সার্বিক উন্নয়নে সরকারের ভূমিকাকে জোরদার করিতে হইলে তাহা অবশ্যই নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনিতে হইবে। সেইখানে কোনো অগ্নি-বিদ্যুত্ বা স্থাপত্যগত ঝুঁকি আছে কিনা তাহা চিহ্নিত ও তদারকি করিতে হইবে। আবার তদারককারী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির আচরণও হইতে হইবে ব্যবসাবান্ধব, প্রতিবন্ধক নহে। এই ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।