অর্থনীতি

চা শিল্পের সম্ভাবনা ও উন্নয়ন

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ২১:২০

একসময় বাংলাদেশে কোনো চা বাগান ছিল না। ব্রিটিশ বেনিয়ারা প্রথমে বাংলাদেশে কিছু কিছু এলাকায় চা বাগান সৃজন শুরু করেন। ইতিহাস বলে ব্রিটিশ শাসনের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ১৮৫৬ সালের দিকে তত্কালীন  সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম চা বাগান সৃজন করা হয়। এরপর চট্টগ্রাম এবং সিলেটের অন্যান্য স্থানে একে একে চা বাগান স্থাপিত হতে থাকে। এখন দেশে ছোট বড় মিলিয়ে ১৬৬টি বাণিজ্যিক চা বাগান রয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি, একটি বড় চা বাগানে বাগান সৃজনের জন্য চারা উত্পাদনের নার্সারি থেকে শুরু করে বাগান স্থাপন এবং সেই বাগান থেকে কাঁচা চা পাতা উত্তোলন করে সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে চা উত্পাদনের সফল ইন্ডাস্ট্রি হয়েছে আমাদের দেশে।

সেসব বাগানে অনেক প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপনা কর্মী ও চা শ্রমিক কাজ করার সুযোগ পান। চা শ্রমিকদের বেশিরভাগই নারী (৭৫%)। অর্থাত্ নারী পুরুষের অনুপাত ৪:১। তাতে একদিকে যেমন নারী পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় অপরদিকে তেমনি রপ্তাানিমুখী শিল্পের মাধ্যমে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। ব্রিটিশরা এক সময় এ শিল্পের গোড়াপত্তন করলেও এখন তা অনেকটাই দেশীয় ব্যবসায়ীদের দখলে। কাজেই এটি এখন একটি লাভজনক শিল্প হওয়ায় দিন দিন নতুন নতুন সম্ভাব্য স্থানে তার চাষের আওতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এম এম ইস্পাহানী লিমিটেড, কাজী এন্ড কাজী, দ্য ট্রান্সকম গ্রুপ, জেমস ফিনলে বাংলাদেশ, দ্য ওরিয়ন গ্রুপ, দ্য আবুল খায়ের গ্রুপ, ডানকানস ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেড ইত্যাদি দেশি-বিদেশি কোম্পানি এখন বাংলাদেশে চা উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত।  

বর্তমানে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলেই এর ব্যাপ্তি বেশি। কারণ দেখা গেছে, বৃহত্তর সিলেটের সিলেট জেলা, হবিগঞ্জ জেলা, মৌলভীবাজার জেলা, অপরদিকে চট্টগ্রাম জেলা, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলাতে কয়েকটি করে চা বাগান রয়েছে। সাম্প্রতিককালে অল্প পরিমাণে চা চাষ শুরু হয়েছে পঞ্চগড় জেলায়। পাশাপাশি আরো কয়েকটি জেলায় একই আবহাওয়া বিরাজ করায় ভারতের সীমান্তবর্তী ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে দেশের মধ্যাঞ্চলে ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় অর্থাত্ শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণায় গারো পাহাড়ের পাদদেশে চা আবাদ সম্প্রসারণ সম্ভব। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের দ্বারা পরীক্ষামূলকভাবে এসব এলাকায় চা আবাদের সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

আমরা জানি, চা আবাদের জন্য উঁচু ও বেলেদোঁয়াশ প্রকৃতির জমি প্রয়োজন। আবার সেখানে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হওয়া প্রয়োজন। তবে শর্ত থাকে যে, প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও সেখানে পানি আটকাতে পারবে না। ছোট ছোট পাহাড় ও টিলা আছে এমন স্থানই তার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। কাজেই এসব বিবেচনাতেই উপরে উল্লিখিত স্থানসমূহে চা আবাদ করা হয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে, এমন আবহাওয়া বিরাজ করে দেশে আরো অনেক স্থান রয়েছে যেখানে চা বাগান স্থাপন করা যেতে পারে। কারণ চা বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য। চা চাষ ও উত্পাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। এখাতে দেশে বর্তমানে ৪ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। দেশের যেসব স্থানে অন্য কোনো ফসল ফলানো সম্ভব নয়, প্রকারান্তরে পাহাড়ি বলে এসব স্থান অনাবাদি থাকে, সেখানেই চায়ের আবাদ ভালো হয়। তাই নতুন নতুন স্থানে এর আবাদ বাড়াতে পারলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। সেক্ষেত্রে সরকারের চা বোর্ড, চা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি বিভাগের যৌথ সহযোগিতা প্রয়োজন।

n লেখক : কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়