একমাত্র জনসচেতনতাই খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করতে পারে

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ২১:২১

সবকিছু ছাপিয়ে খাদ্যে ভেজাল বর্তমানে এক জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ভেজালবিরোধী অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে, কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। বাজারে এমন খাবার খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, যার মধ্যে কোনো ভেজাল বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপাদান মিশ্রিত নেই। মাছ-মাংস, শাকসবজি, চাল-ডাল, দুধ, ফল-মূল সবকিছুতেই এমনকি বিদেশ থেকে আসা বিভিন্ন ফল ও খাবারেও ভেজাল বা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান মিলছে।

ভেজালবিরোধী অভিযান বা আলোচনা-সমালোচনা করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর সমাধানে খাবারে ভেজালের কারণগুলোও অনুসন্ধান করতে হবে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় এবং ভেজাল খাদ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাই এই সমস্যার প্রধান কারণ। সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণেই গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র নকল ও ভেজাল ব্যবসায়ীরা তাদের এই লাভজনক ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছে। এছাড়া  এই ভেজাল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। আমাদের মনে রাখতে হবে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য উপাদানের চাহিদাও বাড়তে থাকে। এই ব্যাপক চাহিদা পূরণের জন্যই নানা উপায়ে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের প্রবণতাও বেড়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে মাছ-মাংস, শাকসবজি, ফল, দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে, যা সংরক্ষণে সহায়তা করলেও খাদ্যদ্রব্যকে মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করে। অন্যদিকে কৃষি উত্পাদন বাড়াতে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব খাদ্যদ্রব্যেও থাকে। এমনকি নদ-নদীর অতিমাত্রায় দূষিত পানি ব্যবহার করে যে ফসল বা শাকসবজি ফলানো হচ্ছে, সেগুলোতেও মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। বর্তমানে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মাছ চাষে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরিবর্তে প্রাকৃতিক নিয়মে বা প্রচলিত পদ্ধতিতে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মাছ চাষ করে বর্তমানে দেশের বিরাট জনসংখ্যার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকের প্রতিই আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নেতিবাচক দিকটি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা ভেবে দেখতে হবে। এছাড়া খাদ্য সংরক্ষণ বা ভেজাল প্রক্রিয়া উত্পাদনকারী থেকে শুরু করে আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে ঘটে থাকে।  

কাজেই এই সমস্যার পেছনের কারণগুলো যেমন অত্যন্ত জটিল ও কঠিন, সমাধানও খুব সহজ নয়। যেখানে দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারছে না, সেখানে ভেজালমুক্ত বিশুদ্ধ খাবার নিশ্চিত করা খুবই কঠিন। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ২০১৩ সালে  ‘নিরাপদ খাদ্য বিল’ পাস হয়। এই আইনে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড  ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু শুধু ভেজালবিরোধী অভিযান বা শাস্তির ব্যবস্থা করলেই দেশজুড়ে বিস্তৃত ও ব্যাপক নকল পণ্য ও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির চেষ্টাও চালাতে হবে। একইসঙ্গে জনগণকে নকল ও ভেজাল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ নিজেরাই নকল ও ভেজাল পণ্য প্রত্যাখ্যান করতে পারে। সাধারণ মানুষ যখন নকল ও ভেজাল সম্পর্কে সচেতন হবে, একমাত্র তখনই এই সমস্যার  সমাধান সম্ভব হবে।     

ফরিদপুর