‘বড় সর্দার বাড়ির গল্প’

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৫, ১৩:০৮
বার ভুঁইয়ার সময় থেকে ঔপনিবেশিক আমলের সাক্ষ্য বহনকারী সোনারগাঁওয়ের বড় সর্দার বাড়ি। সোনারগাঁওয়ের লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের সীমানায় অবস্থিত বিখ্যাত এ বাড়িটি মুসলিম স্থাপনায় ঔপনিবেশিক শাসনামলের আবাসিক ভবনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রান্তে ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে সরকার অধিগ্রহণ করার পর এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। আশির দশকের গোড়ার দিকে প্রত্নতত্ত্ব্ব বিভাগ কর্তৃক উদ্ধার ও আংশিক সংস্কার করার পর এটিকে ন্যাশনাল ফোক আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট মিউজিয়াম হিসেবে গড়ে তোলা হয়। কিন্তু যথাযথ সংস্কারের অভাবে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল এর অনেক অজানা ইতিহাস। বর্তমানে পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের কাজ চলছে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া অনেক ইতিহাসও বের হয়ে আসছে। প্রায় তিন বছর আগে কর্েপারেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে এটি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয় বহুজাতিক কোম্পানি ইয়ংওয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান কিহাক সাং। তিনি বড় সর্দার বাড়ি যথাযথ ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেন। এককভাবে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের কেইপিজেডের প্রেসিডেন্ট জাহাঙ্গির সাদাত ইত্তেফাককে বলেন, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বড় সর্দার বাড়িকে যথাসম্ভব প্রকৃত সৌন্দর্যে ফিরিয়ে আনা, যা এদেশের মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য তুলে ধরবে। ভৌত অবকাঠামো ফিরিয়ে আনার পর সর্দারদের জীবন ধারাকে জীবন্ত করে তোলা হবে। দীর্ঘ ৩৫ বছর বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে এদেশের মানুষের সাথে আত্মিক সম্পর্ক হয়ে উঠেছে কি হাক সাংয়ের। তারই অংশ হিসেবে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। পুরার্কীতি পুনরুদ্ধারের জন্য সব ধরনের ব্যয়ভার বহন করবেন তিনি। এ ধরনের উদ্যেগে আরও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
 
প্রকল্পের পরিচালক স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ জানালেন, সংস্কার কাজ শেষ হলে এটি হবে শত বছরের ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলীর নির্দশন। এর মাঝ দিয়ে গড়ে ওঠা চলার পথে হাঁটলে বার ভুঁইয়ার সময় থেকে ঔপনিবেশিক আমলে ঘুরে বেড়ানোর অনুভূতি পাওয়া যাবে। তিনি জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, দোতলা এই বড় সর্দার বাড়ি দুটি ভাগে গড়ে উঠেছে। মধ্যভাগে লাল রঙের বর্গাকৃতির ভবনটি প্রাচীন মুঘল আমলের স্থাপনার কথা মনে করিয়ে দেয়, যা বাংলার বার ভুঁইয়ার সময়ে গড়ে উঠেছে। ছোট প্রবেশমুখের ভবনটির দেয়ালের লিখন থেকে জানা যায়, ঐতিহাসিক এই আবাসিক ভবনের পেছনের আঙ্গিনার চারপাশে তিনটি ভবন মুঘল আমলের প্রথম দিকে নির্মিত। সম্মুখভাগ ১৯০২ সালে নির্মাণ করা হয়। নিদর্শন থেকে জানা যায়, এই অংশ শিল্প-কারখানার কাজে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানের প্রধান ফটক একটি আর্কওয়ের ভেতর দিয়ে, যা অপেক্ষাকৃত নিচু এবং চিন্নিটিকরি (চীনা সিরামিকের ভাঙা অংশ) দিয়ে সুসজ্জিত। ভবনের রাজকীয় সামনের অংশ পশ্চিমের পুকুরের ধারে। মোট ২৭ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ভবনের নিচতলায় ৪৭টি ও দোতলায় ৩৮টি কক্ষ রয়েছে।
 
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলার প্রাচীন মুসলিম শাসকগণের আমলে ১২৯৬ সাল থেকে ১৬০৮ সাল পর্যন্ত সোনারগাঁও বাংলার রাজধানী ছিল। সে সময় সোনারগাঁও মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। ১৬০৮ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় শাসকের আমলে সোনারগাঁও থেকে বর্তমান ঢাকায় (তদানীন্তন জাহাঙ্গীরনগর) বাংলার রাজধানী স্থানান্তর করার পর সোনারগাঁওয়ের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য হ্রাস পায়। এর ফলে ১৬০৮ সাল থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত একটি উল্লেখযোগ্য সময়ের জন্য সোনারগাঁওয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে যায়।
 
সোনারগাঁও এবং এর আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা অভিজাত আবাসিক ভবনসমূহ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রসমূহ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে এই এলাকায় বসবাসকারী অধিবাসীদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বাক্ষর বহন করে, যা পরবর্তীতে ১৮ শতকের শেষ থেকে ২০ শতকের শুরু পর্যন্ত সময়ে হিন্দু জমিদার এবং সাওদাগরদের সময়ে আবার দেখা যায়। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর হিন্দু পরিবারগুলো সোনারগাঁও ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর পুরো এলাকা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। কালক্রমে প্রাচীন এই রাজধানীর সাংস্কৃতিক সম্পদের বিলুপ্তির প্রধান কারণ হয়ে পড়ে। ড. আবু সাঈদ আরও জানালেন, সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে উচ্চ সজ্জার দেয়াল, ফ্লোরের ফিনিশিং কাজ, চিন্নিটিকরি সাজসজ্জা, কাঠের বিমের প্রতিস্থাপন, দরজা, জানালা, মূল ফটক, কাচের ছাদ, পুকুরের পশ্চিমপাড়ের ঘাট সংস্কার করা হচ্ছে। চলতি বছরের নভেম্বর নাগাদ কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।