দুই বাংলার দুই বৈশাখ

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৫, ১৩:১০
বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিচ্ছবি যে উত্সবের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠে, তাহলো ‘বাংলা বর্ষবরণ’। যদিও বাঙালি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, তথাপি বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলাই মূলত বাঙালিদের আদি নিবাস। বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে, কালের পরিক্রমায় বাংলা হয়েছে দুই বাংলা কিন্তু ভূমি বিভক্ত হলেও হয়েছে কি মনের বিভক্তি? হয়েছে কি সাংস্কৃতিক বিভক্তি? বিভক্তি হয়তো কিছুটা হয়েছে, আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার বিভিন্নতায়। তবুও তো আমরা সবাই বাঙালি, একই ভাষায় কথা বলি। এটা এমন এক সত্য, যা আমরা কখনই অস্বীকার করতে পারি না। ধর্ম পরিবর্তন করা যায়, নাগরিকত্ব পরিবর্তন করা যায় কিন্তু জাতিতে আমরা বাঙালি—এটা পরিবর্তন করব কিভাবে? বাংলা বর্ষবরণের তারিখ নিয়েও দুই বাংলার মধ্যে রয়েছে পার্থক্য। বাঙালিরা খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে আর ওপারের বাঙালিরা পালন করে ১৫ এপ্রিল। জাতিগত দিক থেকে এক হওয়ার পরেও এই সার্বজনীন উত্সবটি পালনে কেন এই বিভক্তি? এই বিভক্তির পেছনের ইতিহাস নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।
 
কায়েদে আযমের হাতিয়ার ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’  
বিতর্কিত ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের’ বয়স ৬২ বছর। এত বছরেও তা একেবারে পুরোনো হয়নি। রাজনৈতিকভাবে যে একটি নির্দিষ্ট স্থানের ভূগোল পাল্টে দেওয়া যায়, তার নমুনা বিশ্ব দেখেছে সেই ’৪৭-এর গ্রীষ্মে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ‘পাকিস্তানের জাতির পিতা’ হিন্দু-মুসলিম সাধারণ মানুষগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রণয়ন করেন। এর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক এবং পূর্ব বাংলায় তার অনুসারীরা বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেছে, একে নানা কৌশলে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কারণ এরমধ্যে তারা দ্বিজাতিতত্ত্বের মৃত্যুবীজের অঙ্কুরোদগম লক্ষ করেছে। তাই এর বিরুদ্ধে শুরু করেছে বাঙালিকে জাতিগত নিপীড়ন, তার আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে দেওয়ার কূটকৌশল। এই ধারাতেই বাধা এসেছে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনেও। জৌলুস হারিয়েছে হালখাতা অনুষ্ঠানটি। নববর্ষের অন্যান্য গ্রামীণ অনুষ্ঠান যেমন—কাঠি নাচ, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, হাডুডু খেলা এবং নানা রকমের মেলার নাম উল্লেখ করা যায়। এসব উত্সব বা প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সার্বিক আনন্দের উত্স এবং ঐতিহ্যে অংশগ্রহণের উপযোগী মাধ্যম। কিন্তু এসব অনুষ্ঠানকে নববর্ষের উত্সবের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্তও করে নেওয়া হয়নি।
 
ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র-কাঠামোর মধ্যেও নব-উদ্ভুত শিক্ষিত বাঙালি নগরবাসী তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নানা গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ক্রিয়াকরণকে জাতীয় আধারে বিন্যস্ত করে নতুন এক সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক জাতিগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে শামিল হতে প্রয়াসী হয়। কিন্তু এ প্রয়াস বেশিদূর অগ্রসর হয়নি।
তবে ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ উত্খাত হয়ে যাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দান করেন এবং সে বছর বিপুল উত্সাহে বাঙালি তার নববর্ষ উদযাপন করে।
 
আইয়ুবের সামরিক শাসন
১৯৫৮-এ আইয়ুবের সামরিক শাসন জারি হওয়ায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা, গণমুখী সংস্কৃতির অনুশীলন একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতদিন মুখ বুজে থাকা নির্ভীক বাঙালির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক নবজাগরণের উত্সমুখ খুলে যাওয়ায় তত্কালীন আইয়ুব, সামরিক শাসক ৯২-ক ধারা জারি করে স্বৈরশাসন বহাল রাখেন, সেই সাথে রাজনৈতিক কর্মী ও সাংস্কৃতিকক্ষেত্রের প্রগতিশীল সক্রিয়বাদীদের বিপুলহারে গ্রেপ্তার করায় রাজনীতি ও সংস্কৃতির যে মুক্তধারার যে উত্সমুখটি খুলে গিয়েছিল, তা আবার অবরুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু জনতার সংগ্রাম থেমে থাকে না এবং থাকেওনি। ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগ বের করে গোপন লিফলেট ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’। ১৯৬২-তে চার ছাত্রনেতার নেতৃত্বে ‘স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস’ এবং সেই বছরই ‘দেশ ও কৃষ্টি’ বইয়ে ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন সামরিক স্বৈরতন্ত্রের উপর আঘাত হানে। ক্রমেই বাঙালির ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। এই সময়ের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’ এক নতুন ও নব দিকনির্দেশক স্লোগান হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাঙালির চেতনার তীব্র চাপে সে বছর, ১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক সরকার বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করে! সেদিন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত নববর্ষের অনুষ্ঠানে অভূতপূর্ব জনগণের সমাবেশ হয়। বাংলা একাডেমি, পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ, ছায়ানট, পাকিস্তান তমুদ্দিন মজলিস, গীতিকলা সংসদ, ঢাকা মেডিকেল ছাত্র সংসদ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ—এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সমাবর্তন অনুষ্ঠানের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার পরেও বাংলা একাডেমির বটতলায় ‘ঐকতানের’ অনুষ্ঠানে এত দর্শক-শ্রোতার সমাগম হয় যে, ততকালীন দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ বিস্ময় প্রকাশ করে।
 
বাঙালির বর্ষপঞ্জি
এটি হয়তো অনেকে জানেও না যে, পশ্চিমবঙ্গে যেদিন বাংলা নববর্ষ পালিত হয় তার  আগের দিনই আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়ে যায়! কারণ হলো বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার করা হয়েছে। ফলে এখানে হয়েছে নতুন পঞ্জিকা, যা পশ্চিমবঙ্গের পঞ্জিকা থেকে একটু এগিয়ে গেছে, তাই আমরা একদিন আগেই সরার পান্তা ভাতটুকু খেয়ে ফেলি। চন্দ্রসন হিজরিকে সৌর গণনার হিসেবে এনে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা সনের উদ্ভব ঘটে। কিন্তু এই সন গণনার দিন থেকে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে বিভিন্ন অমিল দেখা দেয়। তাই ১৯৫২ সালে বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিদ ড. মেঘনাদ সাহা ভারতে প্রচলিত প্রাচীন বর্ষপঞ্জির আমূল সংস্কার করেন। সেই অনুসারে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ হওয়ার কথা। ড. মেঘনাদ সাহাকে সমর্থন করেন ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। কিন্তু সনাতনপন্থী পঞ্জিকাকারেরা তার প্রস্তাব গ্রহণ না করায় দুই দেশের বাঙালিদের মধ্যে একই উত্সব ভিন্ন দিনে পালন করা হচ্ছে। কৌতুক করে বলা যায়, বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব দিকে বলে এখানে সূর্য আগে ওঠে, তাই আমাদের নববর্ষও আগে হয়ে যায়! পৃথিবীতে কোনো সভ্য জাতির পঞ্জিকায় এমন গোল আর নেই।
২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর, বাংলা ১৪১২ বঙ্গাব্দে ঢাকায় একটি সার্ক সম্মেলন হয়েছিল। কিন্তু তারিখ নিয়ে দুই বাংলায় গোলমাল লেগে যায়। ঢাকার তারিখ ২৮ কার্তিক, কলকাতার ‘আনন্দবাজার পত্রিকার’ তারিখ ২৬ কার্তিক, আর কলকাতারই অন্য সংবাদপত্র ও ক্যালেন্ডারের তারিখ ২৫ কার্তিক। একই দিনের তিনটি বাংলা তারিখ ২৫, ২৬, ২৮ একটু গোলমেলেই লাগে বটে!
 
স্বাধীন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে পঞ্জিকা সংস্কারের কালে মতবিনিময় হয়নি। হলে এই অবস্থা হতো না। রাজনৈতিকভাবে বাঙালিরা দুই দেশে দুটি জাতি হতে পারে, ভাষা এবং সংস্কৃতি তো তাদের আলাদা হয়ে যায়নি, তাই বানান, ব্যাকরণ এবং পঞ্জিকা সংকট যত শীঘ্র সম্ভব মিটিয়ে নিতে পারলে পান্তা ভাত আর ইলিশের আমেজটা আরেকটু উত্সবমুখর হতো।
 
ধর্ম, রাজনীতি, কালের পরিক্রমায় এপার ও ওপারের বাঙালির যে অভিন্ন সংস্কৃতি, জাতিসত্তা একসময় ছিল তা আজ দু টুকরো হয়ে ধরা পড়ে একই নববর্ষ ভিন্ন ভিন্ন দুটি দিনে উদযাপনের মধ্য দিয়ে। সীমানা যেন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে একটি সার্বজনীন উত্সবের মাঝেও। এই সীমা পেরিয়ে আমরা, বাঙালিরা একই সাথে বৈশাখের গান গাইতে চাই, হালখাতায় লাভ-লোকসানের হিসাব লিপিবদ্ধ করতে চাই। আবারও বাঙালিয়ানা জেগে উঠুক, ফিরে আসুক হারানো ঐতিহ্য। আগামীর কালবৈশাখী ঝড়টা নাহয় রুখে দিই দু পারের বাঙালির সমন্বয়তায়।