সহিংসতায় ক্ষতি ১৭ হাজার কোটি টাকা

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৫, ২৩:৫৩

চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে উত্পাদনের ক্ষতি হয়েছে ১৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এ ক্ষতির ৬৮ ভাগই হয়েছে সেবা খাতে। এছাড়া শিল্প খাতে ২৫ ভাগ এবং কৃষি খাতে ৭ ভাগ ক্ষতি হয়েছে। তবে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির হিসেব এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ‘বাংলাদেশের হালনাগাদ উন্নয়ন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক এই তথ্য দিয়েছে।

সংস্থাটি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, বিগত ৫ জানুয়ারি থেকে টানা হরতাল-অবরোধসহ সহিংসতার ফলে বাংলাদেশের জিডিপি (মোট দেশজ উত্পাদন) প্রবৃদ্ধি এবার ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসবে। দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় থাকলে প্রবৃদ্ধির এই হার ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হবার সম্ভাবনা ছিলো।
 
গতকাল রবিবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। কার্যালয়ের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন সংস্থার কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়োহানেস জাট।
 
জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে অর্থনীতির অনেকগুলো সূচক ইতিবাচক ছিলো। ফলে আমরা ধারণা করেছিলাম প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ কিম্বা তারও বেশি হতে পারে। কিন্তু ২০১৩ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে এবছরের শুরুতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারির পর তিন মাস হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি থাকলেও অর্থনীতির বেশি ক্ষতি হয়েছে প্রথম দুই মাসে। যা চলতি অর্থবছরের জিডিপির ১ শতাংশের সমান। তবে এ হিসেব অনুমান নির্ভর, কোন সরাসরি তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসেব করা হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
 
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের চক্রে (ট্র্যাপ) আটকে গেছে। বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, বিগত এক দশকে আমাদের উত্পাদনশীলতা বেড়েছে, কর্মসংস্থান বেড়েছে, জনসংখ্যাও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু জনতাত্ত্বিক সুবিধা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এ ধরনের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে নারীর কর্মসংস্থানের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। এর মূল কারণ হলো, বাংলাদেশের পুরুষের ৮১ দশমিক ৭ শতাংশ  কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করলেও নারীদের হার মাত্র ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। জাপানে ১৯৯০ সালে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ছিলো ৪৮ শতাংশ। থাইল্যান্ডে ছিলো ৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশ যদি এ পর্যায়ে যেতে পারে তাহলে প্রতিবছর দেশের জিডিপি বাড়বে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১ দশমিক ৬ শতাংশ।
 
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতাই বড় বাধা নয়। বিশ্বমন্দা দীর্ঘায়িত হওয়া, ইউরোর দরপতন, দুর্বল আর্থিক সংস্কার কাঠামোকেও ঝুঁকি হিসাবে উল্লেখ করেন ড. জাহিদ। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দেন তিনি। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গত বছরের মতো এবারও সরকারের প্রণোদনা চালিয়ে নিতে হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
 
এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলেন, অন্যদেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশে ব্যাংক সুদের হার অস্বাভাবিক বেশি নয়। সুদের হার পূর্বের তুলনায় কমলেও ব্যাংকে যে পরিমাণে তারল্য রয়েছে, সে হারে কমেনি। খেলাপি ঋণ বেশি হওয়ার কারণেই সুদের হার আশানুরূপ কমেনি। অন্যদিকে এবছর ঘাটতি অর্থায়নের কোনো সমস্যা হয়নি। রিজার্ভে হাত দিতে হয়নি। কাজেই বলা যায়, বহির্বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তি আছে। মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
 
গত অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত শক্তি আছে। সেই শক্তি দিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও তারা অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যে বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা হয়েছে তার পরের বছরই ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রবৃদ্ধির আকার যাই হোক না কেন। তবে সহিংস পরিস্থিতিতে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
 
আরেক প্রশ্নের জবাবে ড. জাহিদ বলেন, তেলের দাম কমায় অতীতের পুঞ্জিভূত ক্ষতি থেকে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল বিপণন ও সরবরাহকারী সংস্থা বিপিসি। গত বছরের অক্টোবর থেকে লাভ করছে সংস্থাটি। কেবল পেট্রোল-অকটেনে নয়, ডিজেল-কেরোসিনেও লাভ করছে বিপিসি। এটা আমাদের জন্য একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সরকারের বড় আকারের ভর্তুকি কমেছে।

 

এর আগে সূচনা বক্তব্যে ইয়োহানেস জাট বলেন, সহস াব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে ভাল করেছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায়ও দেশটি সোচ্চার ভূমিকা রাখছে। নতুন ব্রিকস ব্যাংক এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকে (এআইআইবি) বাংলাদেশের যোগ দেয়াকে স্বাগত জানান তিনি। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যহ্রাসকে একটি সুযোগ বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের এই কান্ট্রি ডিরেক্টর ।