মাঠ-ঘাট চৌচির, চারদিকে ঝড়ের তাণ্ডব নিয়ে দুয়ারে হাজির হয় বৈশাখ। বুঝতে বাকি থাকে না কালবৈশাখীর প্রলয় নৃত্যের কথা। এভাবেই আসে পহেলা বৈশাখ। মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা—নতুন বছরের শুরুর লগ্নে ধুয়ে মুছে পবিত্র হোক ধরণী, কবিগুরুর এমনই আকুতি আমাদের বাঙালি সত্তাকে প্রতি বছরেই নিয়ে যায় ঐতিহ্যের দিকে। পহেলা বৈশাখ উদযাপন আমাদের বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রবাহকে বাঁচিয়ে রাখে। পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের সবচেড়ে বড় সার্বজনীন উত্সব হিসেবে বিবেচিত। এদিন সবাই পেছনে ফেলে আসা শোক, দুঃখ, হতাশা সবকিছু ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা করে আসন্ন বছর যেন হয় সুখের, সবকিছু হয় যেন সুন্দর। মূলত প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্কের আমল থেকেই বাংলা সন গণনার কাজ শুরু হলেও তা পূর্ণতা পায় সম্রাট আকবরের শাসনামলে। ইতিহাস বলে, মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে ইসলামিক হিজরি অনুসারে কৃষি ও ভূমির খাজনা আদায় করা হতো। সৌর-নির্ভর হওয়ায় হিজরি পঞ্জিকা কৃষিবছর ও অর্থবছর একই সময়ে হতো না। অসময়ে খাজনা পরিশোধ করতে হতো বলে কৃষকদের নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হতো। সহজে খাজনা আদায়ের জন্য সম্রাট আকবর আমির ফাতেউল্লাহ সিরাজিকে বাংলা বর্ষপঞ্জি তৈরি করার আদেশ দেন। তিনি সৌর হিন্দু ও চান্দ্র হিজরি বর্ষবঞ্জির উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জি তৈরি করেন হিজরি ৯৬৩ সনে, যা ছিল ইংরেজি ১৫৫৬ সালের ১১ এপ্রিল। আর মোগল আমলেই বাংলা বর্ষপঞ্জিকে রাজ্যব্যাপী সরকারি মর্যাদা দেওয়া হয়। সেই থেকে পালিত হয় বাংলা সন আর পহেলা বৈশাখে নববর্ষ। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের প্রথম খবর ১৯১৭ সালে পাওয়া যায়। তখন প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এরপর ১৯৩৮ সালেও একই কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এর পুনঃজাগরণ ঘটায়। এভাবেই বাঙালির আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের শুরু হয়। নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট এই রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। ঢাকার বৈশাখী বা নববর্ষ উত্সবের আবশ্যিক একটি অংশ হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের অন্যতম একটি আকর্ষণ। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে এখানেই শেষ হয়। ১৯৮৩ সালে রমনা বটমূলে কয়েকজন বাংলা সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষ প্রথম পান্তা-ইলিশের সূচনা করেন। তখন পান্তা-ইলিশের সাথে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে করা হয় এই আয়োজন। এভাবেই রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশের সূচনা হয়, যা আমাদের বাঙালিয়ানার পরিচয় বহন করে। আর এখন তো এ পান্তা-ইলিশ ছাড়া নববর্ষ চিন্তাই করা যায় না।
মানুষের আচার ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্য, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি ইত্যাদি যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে তাই সংস্কৃতি। এগুলোকে দু ভাবে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগ নিত্যদিনের জীবনযাপনের সাথে সম্পর্কিত, আর দ্বিতীয় ভাগ জীবন উপভোগের ব্যবস্থা এবং উপকরণের সাথে সম্পর্কিত। মানুষের সার্বিক জীবনকে নিয়েই তো তার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। প্রত্যেক শিশুই সর্বপ্রথম তার সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয় পরিবার থেকে। পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। আমাদের সংস্কৃতি বিবর্তিত হয়ে কোন পথে এগোচ্ছে তা আলোচনার দাবি রাখে। বাংলা সংস্কৃতির চর্চা থেকে দিন দিনই দূরে সরে যাচ্ছে আমাদের বর্তমান তরুণরা। তারা বাংলায় ভালো করে কথা বলে না, বাংলা উচ্চারণ জানে না, বাংলা গান শোনে না। তাদের পোশাক-আশাকেও এ দেশের সংস্কৃতির ছোঁয়া সেভাবে দেখা যায় না, যেভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ছায়া চোখে পড়ে। বাংলা সংস্কৃতিকে বিদায় জানিয়ে তারা ভিনদেশি সংস্কৃতি চর্চাতেই বেশি অভ্যস্ত। তরুণদের এই বিদেশি সংস্কৃতির বন্দনা একটু একটু করে বাঙালিয়ানা থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। উত্সব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী কিন্তু উত্সবের দিনে মানুষ বৃহত্, সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহত্, সেদিন সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহত্।’ আর এই উত্সবকে ঘিরে নতুন প্রজন্মের প্রস্তুতিটা একটু বেশিই। কিন্তু অনেকাংশেই দেখা যাবে বৈশাখ প্রথম দিনে পান্তা খাওয়ার জন্য পথে নামবে ফাস্ট ফুড জেনারেশন। চড়া দামে ইলিশ মাছের একটা ছোট টুকরো নিয়ে বাঙালি হওয়ার গর্ব করতে দেখা যায় অনেককেই। ওইদিন ফাস্ট ফুড কিংবা রেস্টুরেন্টগুলোর মেন্যুতে স্পেশাল আইটেম হিসেবে ঠাঁই পাবে পান্তা-ইলিশ। যেন পুরো একদিনের জন্য আমরা সবাই মনে-প্রাণে বাঙালি। যেন এই দিনটি বাঙালিয়ানার মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ানোর দিন। বৈশাখ উদযাপনে প্রাণের এ সাড়া, হূদয়ের টানে ছুটে আসার লক্ষ্য যদি এ দেশ, এ মাটি ও এ বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির টানে না হয়ে শুধু একটি হুজুগের বিষয়ে পরিণত হয়, শুধু উত্সব উত্সব খেলা হয়, তবে তা বাংলা সংস্কৃতিকে ধরে রাখা ও তার বিকাশে কোনো অবদানই রাখতে পারবে না। মূলের দিকে ফেরা, নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করা মূল্যবোধগুলো চর্চায় এ উত্সবের কোনো ভূমিকাই থাকবে না। হয়তো বৈশাখ বরণের এ উত্সব আরও বৃহত্ হতে বৃহত্তর হয়ে উঠবে, ফ্যাশন হাউসগুলোয় ভিড় আরও হয়তো বাড়বে, পান্তা-ইলিশের হুজুগে ইলিশের দাম হয়তো আরও আকাশচুম্বী হবে, ব্যবসার আরও স্ফীতি ঘটবে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে বৈশাখ বরণ, তা কখনোই পূর্ণতা পাবে না। কারণ বেলুন যতই ফাঁপানো হোক না কেন, তার ভেতরে শুধু বাতাস ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তাই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পাশ কাটিয়ে, মূলের বিকৃতি ঘটিয়ে বৈশাখ নিয়ে যতই মাতামাতি হোক না কেন, তাতে প্রকৃত কোনো মঙ্গল আসবে না। বাংলা সংস্কৃতির উন্নতি চাইলে, নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরতে হলে সেভাবেই বাংলাকে সাজাতে হবে, আত্মস্থ করতে হবে এবং সেভাবেই নতুন প্রজন্মের কাছে তা উপস্থাপন করতে হবে। বিকৃত বা খণ্ডিত উপস্থাপন তাদের শুধু ভুল আর বিকৃত বিষয়ই শেখাবে, মূল জিনিসের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। হাজারও মানুষের এ মিলনমেলাকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। এখান থেকেই বীজ বপন করতে হবে। বৈশাখ বরণের এ আয়োজন, এ প্রাণের মেলাকে তাই আমরা স্বাগত জানাই, তবে এরমধ্যে কিছু সারবত্তা থাকতে হবে, তাতে প্রকৃত প্রাণের স্পন্দন মেলাতে হবে তবেই এ প্রাণের মেলা, জনতার এই ঢল আর এ উত্সব শুভ-সুন্দর ও কল্যাণময় হয়ে উঠবে।‑
