রঙের বৈশাখ

আপডেট : ১৭ মে ২০১৫, ১৫:০১

 

বাঙালি উত্সবমুখর জাতি এবং উজ্জ্বল রঙেই তার প্রকাশ। যেকোনো সার্বজনীন উত্সবে এই অঞ্চলে ঐতিহ্যগত রঙের ব্যবহারই বেশি হয়।

 

প্রকৃতিতে বৈশাখের নিজস্ব একটা রং আছে, তার প্রকাশ ঘটলে বদলে যায় বাঙালির রূপ। নতুন রঙে বাংলার জীবনকে রাঙাতে আসে বৈশাখ।

 

পয়লা বৈশাখ নিয়ে বাঙালিদের উত্সাহ ও ব্যস্ততা অন্য আর সব উত্সবের আমেজকে ছাড়িয়ে যায়। অন্যান্য অনেক আয়োজনের সঙ্গে নতুন পোশাক পরাও পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রধান একটি অনুষঙ্গ। উত্সবের পোশাকে রঙের ছটা তো থাকেই। রঙ সবসময়ই দেশ-কাল-পাত্রভেদে একেক ধরনের অর্থ বহন করে। 

 

আমাদের কাছে সাদা পবিত্রতা, কালো শোক, লাল উত্সব। আমাদের দেশে লাল-সবুজ মানেই পতাকা, যা কিনা প্রকাশ করে স্বাধীনতা বা দেশপ্রেমের চেতনা, অপরদিকে সাদা-কালো মানেই একুশে ফেব্রুয়ারি, তেমনি পয়লা বৈশাখ মানেই লাল-সাদা।

 

বৈশাখের চিরায়ত রং সাদা-লালের চল কেন বা কবে থেকে, এ বিষয়ে মতভেদ আছে। কারও মতে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বৈশাখের প্রধান আয়োজন হালখাতা, যার মোড়কের অংশ লাল এবং ভেতরের পাতার রং সাদা, সেখান থেকে লাল-সাদা আসতে পারে। অনেকে মনে করেন, আগেকার দিনে হিন্দু নারী লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে বিভিন্ন পূজা-পার্বণে অংশ নিত, সেখান থেকেও লাল-সাদা আসতে পারে।

 

যদিও এসব কারণের পেছনে গ্রহণযোগ্য যুক্তি তেমন পাওয়া যায় না। কারণ, সাধারণভাবেই অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারে, মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাল পেড়ে সাদা শাড়ির প্রচলন ছিল। বাস্তবতা হলো, ধীরে-ধীরে তা উত্সবের পোশাকে পরিণত হয়েছে।

 

বাঙালির যেকোনো উত্সবেই লাল রঙের একটা প্রাধান্য সবসময়ই ছিল এবং আছে। ধারণা করা হয়, যেহেতু বৈশাখের প্রথম দিন বেশ গরম থাকে, তাই স্বস্তির কথা ভেবে সাদা ও উত্সবের চিহ্ন হিসেবে লাল রঙের ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া এ উপমহাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় উত্সব পূজা-পার্বণেও লাল-সাদা ব্যবহারের প্রচলন বহু পুরোনো। ফলে বৈশাখের সঙ্গে লাল-সাদার সুদীর্ঘ সময়ের সখ্য থাকায় তা বর্ষশুরুর চিরন্তন রঙে পরিণত হয়েছে।

 

বৈশাখের রং লাল-সাদা হওয়ার কারণ যা-ই হোক, তা শুরু থেকে সার্বজনীনভাবে মান্য হয়েছিল। রমনার বটমূলে ছায়ানটের আনুষ্ঠানিক বর্ষবরণের মাধ্যমে এর কিছুটা বিস্তৃতি ঘটে।

 

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের বৈশাখী আয়োজনে লাল-সাদাকেই প্রেরণা হিসেবে বেছে নেওয়ার ধারাটি গতিশীল থাকে এবং স্বাভাবিকভাবে বৈশাখের রং হিসেবে সাদা-লাল ফ্যাশনে প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব পেয়ে যায়।

 

শুরুটা লাল-সাদা দিয়ে হলেও বৈশাখের পোশাকে ২০০৬-০৭-এর দিক থেকে অন্যান্য রং যেমন—পেস্ট, কালো, হলুদ, মেরুন, গোল্ডেন, ম্যাজেন্টা ও সবুজের বিভিন্ন শেডের ব্যবহার দেখা যায়। তবে আগেরটি মূল প্রেরণার মধ্যে রয়ে যায়। মানুষ বৈশাখের উত্সবে লাল-সাদাকেই বেশি পছন্দ করে। ফলে এর প্রাধান্য বেড়েছে এবং এটিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। অন্য সব উত্সবে বিচিত্র রং ব্যবহার করার এবং সেসব পাল্টে নেওয়ার সুযোগ আছে কিন্তু বৈশাখের ফ্যাশনে তা নেই এবং এটাই ভালো।