বাংলাদেশের নারী আজ কৃষি কাজ করে বিপ্লব ঘটিয়ে চলছে। নারী কৃষিখাতে পুরুষের চেয়েও অনেক এগিয়ে গেছে। আগে নারীর এই বিপ্লবকে নীরব বিপ্লব বলা হলেও এখন আর তা বলার সুযোগ নেই। জানাচ্ছেন মোহাম্মদ ওমর ফারুক
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের গুদিঘাটা গ্রামের হানিফ হাওলাদারের স্ত্রী পারুল বেগম সংসার সামলানোর পাশাপাশি কৃষিবান্ধব নারী হিসেবে নীরবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নিজের এলাকায়। পারুলের বসতবাড়ির আঙিনা ও পুকুর পাড় জুড়ে নানা মৌসুমি সবজি আর পুকর ভরা মাছের আবাদ। গড়ে তুলেছেন দৃশ্যত এক খামার বাড়ি; সেই সঙ্গে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি প্রতিপালন করে এখন পুরো সংসারের দায় তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে। কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পারুল আজ পরিচিত সবার কাছে। অনেক কৃষাণীর কাছে আবার অনুকরণীয় এই কৃষাণী। বাংলাদেশে শুধু একজন পারুল নয় লক্ষ লক্ষ পারুল আজ কৃষি কাজ করে বিপ্লব ঘটিয়ে চলছে। যারা পুরুষদের চেয়েও অনেক এগিয়ে গেছে কৃষিখাতে। আগে নারীর এই বিপ্লবকে নীরব বিপ্লব বলা হলেও এখন আর তা বলার সুযোগ নেই। নারীদের এই বিপ্লব এখন দৃশ্যত। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ধান উত্পাদনের ২১টি কাজের মধ্যে ১৭টি কাজই করে নারী।
সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কৃষি ক্ষেত্রে বর্তমানে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এক দশক আগেও দেশের কৃষিতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ১ কোটি ৫ লাখ নারী কৃষির সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে প্রতি বছর নারী শ্রমিক বেড়েছে ১৭ শতাংশ হারে। বিপরীতে ৩ শতাংশ হারে কমেছে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশের কৃষি শ্রমিকের ৬৪ শতাংশই নারী। সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমবিভাজন নারী শ্রমিকের চাহিদা বেড়েই চলেছে দিন দিন। তুলনামূলক কম ভারী কাজ, বিশেষ করে ফসল বা খাদ্যশস্য কাটার পর এর বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নারীদের। অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে চলা কাজ, ফসলের ক্ষেত তদারকির কাজেও নারীর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সেচকাজের মাধ্যমেও স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারী। তাছাড়া চাতাল শ্রমিকের সিংহভাগই এখন নারী। অন্যদিকে ব্র্যাকের এক গবেষণা বলছে, গত পাঁচ বছরে নারী শ্রমিক বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি হারে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। তবে উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলা বিশেষ করে রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ দ্রুত হারে বাড়ছে। তাছাড়া কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোয় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী মানিকগঞ্জেও কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। দেশে মোট শ্রম শক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে নারী। আবার নারী শ্রম শক্তির মধ্যে ৬৮ শতাংশই কৃষি, বনায়ন ও মত্স্য খাতে জড়িত।
এক জরিপে দেখানো হয় যে, কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে কৃষিকাজে সবচেয়ে বেশি নারী নিয়োজিত রয়েছেন। ফসলের প্রাক বপন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, বীজ সংরক্ষণ পর্যন্ত অনেক কাজ নারী এককভাবেই করে। এছাড়াও বাড়ির বাইরে ফসলের মাঠে সবজি চাষ মসলা উত্পাদন, শুঁটকি ও নোনা মাছ প্রক্রিয়াকরণ, মাছ ধরার জাল তৈরি, পোনা উত্পাদনের কাজও নারীরা করে। বলা চলে কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নারী। গ্রামীণ সমাজে কৃষি ও চাষের কাজকে নারীর প্রাত্যহিক কাজের অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। সেখানে মজুরি প্রদানের বিষয়টি সবসময়ই থাকে অবহেলায়। কোনো দায়িত্বশীল পুরুষ ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে দেশের উত্তরাঞ্চলের নারীপ্রধান ৫৮ শতাংশ পরিবার। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, বিধবার হার উত্তরবঙ্গে সর্বোচ্চ। ফলে এ অঞ্চলের জেলাগুলোয় নারীপ্রধান পরিবারের আধিক্য রয়েছে।
আর ৭২ শতাংশ পরিবারের নারীপ্রধানের বয়স ৩০ থেকে ৪৯ বছর। আবার পরিবারপ্রধান হওয়ার পর ৯০ শতাংশ নারীর পেশা পরিবর্তন হচ্ছে, যারা আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করছেন। উত্তরাঞ্চলের ৬৫ শতাংশ পরিবারপ্রধান নারী এখন এ দুটি খাতে কাজ করছেন। পরিবর্তিত গ্রামীণ অর্থনীতির কারণে কৃষিক্ষেত্রে অধিক সংখ্যক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, চলতি অর্থবছরের উন্নয়ন বরাদ্দ রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ৪৬ শতাংশই ব্যয় করা হচ্ছে নারীর উন্নয়নে। কৃষিখাতের মোট বাজেটের ৩৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ ব্যয় করা হচ্ছে একই কাজে। সামনের দিনগুলোয় কৃষিখাতে শ্রমিক সঙ্কটে নারীই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্স হবে। তবে নারীবান্ধব কৃষির ব্যবস্থা যদি সরকার করতে পারে এবং বাজেটের ক্ষেত্রেও যদি নারীদের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয় তাহলে একসময় নারীরাই কৃষিসমাজকে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মনে করেন অনেকেই।
