গঙ্গার বুকে সুরমার ঢেউ

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৫, ০১:২১

দোহার মানে কোরাস। বাউল, কীর্তন, ঝুমুর, ভাটিয়ালি, চটকা, ভাওয়াইয়া প্রভৃতি গানের মাধ্যমে দোহারের সদস্যরা গান পরিবেশন করেন। দোহারের গায়কীটা একবারেই তাদের; সুনামগঞ্জের রুহী ঠাকুর-সুর্যলালের মতো নন, আবার সিলেটের বান্না-হিমাংশু অথবা ঢাকার সেলিম চৌধুরী-আশিক কিংবা হাবিব-বাপ্পা-মকসুদদের মতো ব্যান্ডের গানও নয়।

 
দোহারের নাম শুনি ২০০০ সালেই, তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘বন্ধুর দেশে’ যখন বেরোয়। হঠাত্ করে চিনতে পারিনি তাদের। শুনি, এটা কলকাতার দল, কিন্তু গাইছে সব বাংলাদেশের গান। এরপর তাদের নতুন অ্যালবাম বেরোলে আমি কলকাতা থেকে আনাই, একসময় ঢাকার বাজারেও তাদের সিডি পাওয়া শুরু হলো। বেশিরভাগ গানই আমার অঞ্চল সিলেটের, ভাটি বাংলার। খবর নিয়ে জানি, যে লোকগুলো এ দলে আছে, তারা ভারতের শিলচরের অরিজিন। একসময় যারা সিলেটের সঙ্গেই ছিল, ডানা ভেঙে এখন শিলচর মাড়িয়ে কলকাতায় উড়ে এসেছে। দোহারের সঙ্গে আমার সাক্ষাত পরিচয় হয় ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট। কলকাতার গোর্কি সদনে সিলেটের বাউল শাহ আব্দুল করিমকে নিয়ে আমার বানানো ‘ভাটির পুরুষ’ তথ্যচিত্র দেখানোর পর দোহারকে মঞ্চে ডেকেছিলেন এ অনুষ্ঠানের আয়োজক সানু ব্যানার্জি। প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর পর এক ঘণ্টা শাহ করিমের গান শুনিয়েছিল দোহার। গানের আসর শেষ হলে আমি গ্রিনরুমে পাকড়াও করি দলনেতা কালিকাপ্রসাদকে। কালিকা আমার কাছে তখন এক বিস্ময়ের নাম। তাকে নিয়ে আমার তখন কত প্রশ্ন। কী করে এ গানগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, সুর বদল করেছেন কিনা, ভাটি থেকে পেরিয়ে সুরমা ছাড়িয়ে গঙ্গার পাড়ে এসে কতটুকু বদলেছে, কেন বদলালো, এসব নিয়েই ছিল আমাদের আলোচনা।
 
বাংলাদেশের গান গেয়েই মূলত দোহারের পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। অধ্যাপক অভিক মজুমদার নাম দিয়েছিলেন দোহার। দোহার মানে কোরাস। বাউল, কীর্তন, ঝুমুর, ভাটিয়ালি, চটকা, ভাওয়াইয়া প্রভৃতি গানের মাধ্যমে দোহারের সদস্যরা গান পরিবেশন করেন।  দোহারের গায়কীটা একবারেই তাদের; সুনামগঞ্জের রুহী ঠাকুর-সুর্যলালের মতো নন, আবার সিলেটের বান্না-হিমাংশু অথবা ঢাকার সেলিম চৌধুরী-আশিক কিংবা হাবিব-বাপ্পা-মকসুদদের মতো ব্যান্ডের গানও নয়। অথচ মূল সুরের সর্বোচ্চ কাছাকাছি থেকে, অবিকৃত কথায় একটা নতুন ব্যঞ্জনা যুক্ত করে তারা বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের গান করেন প্রধানত পশ্চিম বাংলায়। যন্ত্রানুষঙ্গ হিসেবে ঢোল, খোল, মাদল, ধামসা, সারিন্দা, ডুবকি, খঞ্জনি ব্যবহার করেন, ইলেক্ট্রিক কোনো কিছু নেই। গ্রাম্য বাউলদের গানকে তারা নগরের শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটুকুই করছেন, সুরের মৌলিকত্ব ঠিক রেখেই। দোহার কোনো ব্যান্ড নয়, এটা ৮ সদস্যের একটি বাংলা গানের দল। দল প্রধান কালিকাপ্রসাদ, ব্যবস্থাপক রাজীব ছাড়াও আছেন নিরঞ্জন, সত্যজিত্, অমিত, মৃগনাভি ঋত্বিক ও সৌম্য। মূল গায়ক কালিকাই। শিলচরে কালিকার পড়াশোনা কলকাতার রবীন্দ্রভারতীতে। মাস্টার্স করেছেন লোকসঙ্গীতে। সে কারণেই খুব সহজে তার গায়কীতে আবদুল করিম পাঠের মধ্যে কোথাও রবীন্দ্রনাথ, কোথাও সায়েন্স ঢুকে যায়, কোথাও মার্ক্স, কোথাও বা জীবনানন্দ এসে পড়েন। শিলচরের শৈশবটাকে তিনি কোনোভাবেই ঝেড়ে ফেলতে পারেননি বলেই কমলালেবুর ঘ্রাণ ছড়ানো তার সুরের ভেলা। ২০০৮-এর পর থেকে তার সঙ্গে আমার আত্মিক যোগাযোগটা বেড়ে যায়। তিনি ঢাকা গেলে দেখা হয়, আমি কলকাতায় এলে তাকে নিয়ে আড্ডায় বসি। কেন যেন তাকে আমার প্রাণের মানুষ বলে মনে হয়। আমাদের আড্ডায় সারাক্ষণই দুই বাংলার বাউল-ফকির আর তাদের গানই প্রধান হয়ে আসে। আমাদের আড্ডা লালন-রবীন্দ্র থেকে শুরু হয়ে করিমে এসে ঠেকে।
 

এ দল নতুন গান লেখে না, তারা আমাদের শেকড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গানই খুঁজে খুঁজে নিয়ে এসে নাগরিকদের কাছে পরিবেশন করে। রবীন্দ্রনাথ, লালন থেকে শুরু করে শাহনূর, শিতালং, শেখ ভানু, রাধারমন, আরকুম শাহ, হাসন রাজা, রশীদ উদ্দিন, উকিল মুন্সি, দুরবীন শাহ, আব্দুল করিম পর্যন্ত সকলেরই গান করেন। শিলচর-করিমগঞ্জ বা সিলেটের ভাটির ভাঁজে ভাঁজে যেসকল মরমি কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেসবের হাজার পাঁচেক গান তাদের ভাণ্ডারে আছে। এ পর্যন্ত ১০টি অ্যালবামে দেড় শতাধিক গান তারা ছেড়েছেন বাজারে। বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের হাওড়ে বাদারে ফুটে থাকা ফুলগুলোকে তুলে এনে শহরের ড্রইংরুমে সুন্দর ফুলদানিতে পরিবেশন করার মতো একটা ব্রত নিয়েই যেন দোহার আছে কলকাতায়, যেন গঙ্গার বুকে ছড়িয়ে দেওয়া সুরমার ঢেউ।