বৈশাখ ও বর্ণিল বাঙালিয়ানা

আপডেট : ১৭ মে ২০১৫, ১৫:০১
বৈশাখের শেকড় লাল-সাদার পাশাপাশি ছিল হলুদ, সবুজ, নীল, মেজেন্টা ও কমলা। এবারও এসব রঙের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে পোশাকে। এ ছাড়া পোশাকের নকশায় দেশীয় মোটিফে ফিউশনধর্মী ওয়েস্টার্ন প্যাটার্নও নজর কাড়ছে। দেশীয় ব্র্যান্ড পোশাকের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যস্ত ঈদের পাশাপাশি এ সময়টায় নতুন ডিজাইন বৈচিত্র্যের পোশাকি কালেকশন আনতে।
 
 
কালচার ও রিচ্যুয়াল। বাংলায় সংস্কৃতি ও রেওয়াজ। শব্দ দুটি প্রাতিষ্ঠানিক হলেও জরুরি। সংস্কৃতি চিনতে ভাষা-সাহিত্যের পাশাপাশি থাকে চারুশিল্প থেকে শুরু করে খেলাধুলা, সাজ-পোশাক এমনকি খাবার পর্যন্ত। বৈশাখের প্রথম দিনে এই সবকিছু একটা সামগ্রিক রূপ পায়; যাকে এককথায় বলে বাঙালিয়ানা।
 
তাই তো ‘ওই এলোরে ওই এলো/নতুন বর্ষ ওই এলো/তরুণ তপন উঠলোরে/ধ্বস্ত তিমির ছুটলোরে/ নওরোজের এই উত্সবে/ওঠ জেগে আজ ওঠ সবে।’ ‘নববর্ষের আশীর্বাদ’ শিরোনামে কবি গোলাম মোস্তফার কবিতাটি আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। কেননা, বাঙালি তারুণ্য আজ সত্যিই নতুন রূপে জেগেছে বাঙালিয়ানার বেশে।
 
একটা সময় পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেওয়ার এই আয়োজন ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। আর এর ওপর ভিত্তি করেই গ্রামীণ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও বিকাশ হয়। কিন্তু ব্যস্ত নগরজীবনেও এখন নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামকেন্দ্রিক ওই উত্সব এখন হয়ে উঠেছে শহরমুখী। আর শহরের মানুষ এই উত্সবটি উদযাপন করছে নানাভাবে। আর সে কারণে কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে নগরেও। এসবের ফলে দেশে পহেলা বৈশাখকেন্দ্রিক ছোটখাটো একটা অর্থনীতিও গড়ে উঠেছে।
 
নববর্ষ উদযাপনের চেহারা যেমন বদলেছে, এর স্থানান্তরও ঘটেছে। গ্রাম থেকে নগরে। বদলে যাচ্ছে শহুরে জীবনধারাও। তবে বৈশাখের মূল জৌলুস থাকে পোশাক শিল্প ঘিরে।
 
তাই সবার আগে চাই বর্ণিল পোশাক। বেশি সময় ব্যয় হয় এই কাজে। ফলে পছন্দসই পোশাক পেতে ঘোরাঘুরির শেষ নেই। ফ্যাশন ডিজাইনারদের সৃষ্টিশীল মুন্সিয়ানায় পোশাকের নকশা আর রঙে চলছে ট্রেন্ড ভাঙার ট্রেন্ড। বেশ ক’বছর তো রীতিমতো প্রথা ভাঙার ধুম পড়েছিল। রঙের বৈচিত্র্য ছিল বর্ণিল পোশাকি ক্যানভাসে।
 
বৈশাখের শেকড় লাল-সাদার পাশাপাশি ছিল হলুদ, সবুজ, নীল, মেজেন্টা ও কমলা। এবারও এসব রঙের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে পোশাকে। এ ছাড়া পোশাকের নকশায় দেশীয় মোটিফে ফিউশনধর্মী ওয়েস্টার্ন প্যাটার্নও নজর কাড়ছে। দেশীয় ব্র্যান্ড পোশাকের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যস্ত ঈদের পাশাপাশি এ সময়টায় নতুন ডিজাইন বৈচিত্র্যের পোশাকি কালেকশন আনতে।
 
যুগটা বিশ্বায়নের এবং কর্মক্ষেত্র কর্পোরেট। কিন্তু বছরের এ দিনটিতে শ্রেণি-পেশার ভেদ ভুলে সবাই বাঙালি। আলতা-ফিতার জন্য মন কেমন করা ভাবটা আর নেই। অফিস-আদালতেও ছেলেরা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর মেয়েরা লাল পেড়ে শাড়ি পরে হাজির হয়। হঠাত্ই আসতে পারে উপহার, হাতপাখা বা মাটির টেপা পুুতুলসহ পিঠার ঝুড়ি। রেডিও-টিভিতেও বৈশাখের ঘনঘটা।
 
আর যাদের ছুটি, নতুন পোশাকে বছর শুরুর ভোরে, চোখের ঘুমটা পুরোপুরি কাটার আগেই তাদের অনেকেরই গন্তব্য রমনার বটমূল। কেবল সেখানেই যে বর্ষবরণ, তা তো নয়। ফলে কেউ যায় রবীন্দ্র সরোবরে, কেউবা আগারগাঁওয়ে।
 
অর্থাত্ যেখানে নতুন বছরের উত্সব দৃশ্যমান সেখানে মেট্রোপলিটন বাঙালি। তবে রমনার কথা আলাদা। রোজকার ধুলা-ধোঁয়া আর মোটরের যান্ত্রিক হাঁকডাক নেই সেখানে। চারদিকে সবুজ। বুক ভরে নেয়া যাচ্ছে দম। পুবে সূর্যের দেখা মেলার আগেই লোকে লোকারণ্য এলাকাটি। চোখে পড়ে ভিনদেশিদেরও। তাদের সংখ্যাটা বাড়ছে দিন দিন। তবে পোশাকে-আশাকে তারাও আজ বাঙালি। তারপর পান্তা ইলিশ। পান্তা বাঙালির কাছে বাসি ভাত শুধু নয়, তাতে লঙ্কা, পেঁয়াজ আর সরিষার তেল পড়লেই যেন অমৃত সমান। পেটপুজো শেষে চারুকলার শোভাযাত্রা। দিনের দ্বিতীয় ভাগেও থাকে নানা আয়োজন। মেলা, যাত্রা-গম্ভীরা বা হাসন-লালনের গান। একটি দিন খাবার, পোশাক থেকে শুরু করে বিনোদন, ঐতিহ্যের সঙ্গেই পুরো জাতির উদযাপন। সারাদেশ মেতে উঠুক বাঙালিয়ানায় এবং সার্বজনীন উত্সবের রঙে। শুধু প্রার্থনা, অর্থনীতি চাঙা হোক এবং বৈশাখে আসুক নিত্যনতুন পণ্য, কর্পোরেট বিশ্বায়নের এই যান্ত্রিকতার মাঝে বৈশাখ যেন পণ্য না হয়ে যায়!
 
স্বাগত বৈশাখ, স্বাগত ১৪২২।
 
 
 

লেখক : শীর্ষ নির্বাহী, অঞ্জন’স