বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মীর মোশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে চর্যাপদের ডিম থেকে ছানা বেরোনো বাংলা ভাষার হাঁটি হাঁটি পা পা করে যাত্রা শুরু। সময়ের পরিবর্তনে ভাষার চলনের পরিবর্তন হলেও বাংলার অগ্রযাত্রা যেমন থেমে থাকেনি, তেমনি থেমে থাকেনি বাঙালির বাঙালিয়ানাও। বাঙালির হাজার বছরের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, উত্সব, নৃত্য, নাট্য, গীত, বাউল গান, পালাগান, লোকাচার, প্রাত্যহিক জীবনযাপন প্রতিক্ষেত্রেই রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। সেই ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে থাকা ঐতিহ্যের সারাত্সার গ্রহণ করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। বর্তমানকে মেলাবার আর ভবিষ্যতের সুখস্বপ্ন দেখার, ছবি আঁকার। মুসলিম, হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এক পঙক্তিতে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে গাইবে, ‘তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে’। একাকী ঘরে ফিরবে, তখন তার কণ্ঠে থাকবে স্বরূপ অন্বেষার গান, মনের মানুষ খুঁজে ফেরার গান।
মধ্যযুগে বাংলায় পয়ার ছন্দে কবিতা লিখে কবি সৈয়দ সুলতানকে বিশ্বাসঘাতক নামের কলঙ্কিত উপাধি মাথা পেতে নিতে হয়েছিল। আবার সেই মধ্যযুগেই বিপুল উত্সাহেই আরাকানের রোসাং রাজসভায় গভীর দেশপ্রেমের চেতনায় বাংলা চর্চা হতে দেখেছি। এই ভাষার জন্য জীবন দিয়ে এদেশের তরুণেরা ইতিহাস রচনা করেছে। তারই পথ বেয়ে স্বাধীনতা এসেছে। ভাষার কারণেই পৃথিবীর সব জাতির মধ্যে ব্যতিক্রম এবং ভাগ্যবান আমরা। বাংলাভাষাকে কেন্দ্র করেই আমাদের জাতিতে জাতিতে, বর্ণে বর্ণে, ধর্মে ধর্মে মিলন। বটের ঝুরিতে সুতো বাঁধা, দলবেঁধে পীরের দরগায় চেরাগ জ্বালার ইতিহাস বাঙালির সার্বজনীনতার বহিঃপ্রকাশ। অমৃত দীপিত চন্দ্র সূর্যের আলোয় বাংলার মাটিতে তাই আমরা পাই আনন্দ আশ্চর্যের সাক্ষাত্কার।
বাংলার মাটিতে এত বৈভব, ক্ষণজন্মা মধুসূদন তা বুঝেছিলেন স্বদেশ ত্যাগ করে। সে কারণে তার বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে অন্তরের তৃষ্ণা—
‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন—
তাসবে অবোধ আমি অবহেলা করি
পরধন লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ পরদেশে
ভিক্ষা বৃত্তি কুক্ষণে আচরি।’
লোকে বলে, দেশের বাইরে না গেলে দেশকে চেনা যায় না। দেশত্যাগ করে বিদেশে গিয়ে মধুসূদন তীব্রভাবে তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
আমাদের প্রাণের প্রিয় বাংলাকে চিনতে বুঝতে এবং তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশকে খুঁজতে, হূদয়াঙ্গম করতে আমাদের বারবার দাঁড়াতে হয় পহেলা বৈশাখের কাছে। ডাক দিয়ে বলতে হয়, ‘এসো হে বৈশাখ, উড়িয়ে নাও বত্সরের জমে থাকা আবর্জনা, মলিনতা। আলোকের ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও, স্নাত হয়ে শুদ্ধ হই।’
পহেলা বৈশাখের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের চিরন্তন রূপ অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতকে একটি সুতোর মালায় গাঁথি। কান পেতে শুনতে পাই সর্বকালের সকল বাঙালির হূদস্পন্দন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলনের ঐকতান শোনার জন্য কান পেতে থাকি। প্রাণে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। সেকাল আর আজকের কালের পহেলা বৈশাখের মধ্যে বিস্তর ফারাক—নববর্ষের রঙ-রূপ বদলেছে দুই-ই। খোলনলচে বদলালেও আবেদন অভিন্ন। কে কখন কোথা থেকে নববর্ষ পালনের প্রচলন শুরু করেছিলেন কেমন করে পালন করা হতো, সে ইতিহাসের দ্বারস্থ নাইবা হলাম আজ। তোলা থাক তা সযত্নে, সংগোপনে, সিংহাসনে। নতুন বছর বরণে আমাদের পূর্বপুরুষরা যে পদছায়া রেখে গেছেন, তারই ধারাবাহিকতায় আমরা নব নবরূপে, একই সুরে এ বছর আবারও আহ্বান জানাই নববর্ষকে।
বিশাখা নক্ষত্রের আহ্বানে বাতাস এসে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। ছড়িয়ে দিচ্ছে মুঠো মুঠো ভালোবাসা কোষে কোষে, অণুতে পরমাণুতে, বৃক্ষ শাখায়, পাখির ডাকে; আকাশের রঙে চৈত্র সংক্রান্তি শেষে মুগ্ধ চোখে আহ্বান জানাই—স্বাগত ১৪২২।
