বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তে প্রতিবারের ন্যায় এবারও বসেছিল দুই বাংলার মিলন মেলা। এই মিলনমেলায় প্রধান বাধা 'কাঁটাতারের বেড়া'। কিন্তু সে বাধা সত্ত্বেও আপনজনদের সাথে দেখা করতে মানুষের ঢল নামে সীমান্ত এলাকায়। আমাদের পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধির পাঠানো খবর-
পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে অমরখানা ও বোদাপাড়া সীমান্ত। ওপারে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার রায়গঞ্জ থানার খালপাড়া, ভিমভিটা, গোমস্তাবাড়ি ও বড়ুয়াপাড়া গ্রাম। গত মঙ্গলবার নববর্ষের প্রথম দিনটিতে এই সীমান্ত এলাকায় এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ৭৪৪ নম্বর মেইন পিলারের ১ থেকে ৭ নম্বর সাব-পিলার পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার জুড়ে উভয় দেশের লাখো মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর।
প্রতিবারের মত এবারও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দু’দেশে অবস্থানরত আপনজনদের সাথে মোলাকাত করতে এসেছিল তারা। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের অনানুষ্ঠানিক অনুমতিতে সীমান্তে এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়।
বিএসএফ অনুমতি না দেয়ার শংকা থাকলেও সকাল থেকে সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় হাজির হতে থাকে উভয় দেশের নারী-পুরুষ-শিশুরা। সকাল সাড়ে ১০টায় বিএসএফ ভারতীয় নাগরিকদের অনুমতি দিলে তারা চলে আসে তারকাঁটার বেড়ার কাছে। সেইসঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকরাও চলে যায় বেড়ার কাছে। মুহূর্তে মানুষের ঢল নামে সীমান্ত এলাকায়। বিকাল ৪টার দিকে বিজিবি-বিএসএফের বাঁশির ফুঁতে শেষ হয় মিলনমেলা। উভয় দেশের নাগরিকরা ফিরে যান নিজ নিজ বাড়িতে।
স্থানীয়রা জানায়, ১৯৪৭-এ পাক-ভারত বিভক্তির আগ পর্যন্ত বর্তমান পঞ্চগড় জেলার ৫ উপজেলার মধ্যে ৪টিই ছিল ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অধীন। দেশবিভাগের পর এ দেশের অনেকের আত্মীয়-স্বজন ভারতীয় অংশে থেকে যায়। এরপরও উভয় দেশের লোকজন প্রায় বিনা বাধায় যাতায়াত করতে পারলেও ১৯৮০’র দশকে তা থেমে যায়।
পরবর্তীতে ভারত সরকার সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করায় যাতায়াত একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাভাবে পাসপোর্ট ও ভিসা করতে অসমর্থ এই মানুষদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর সে কারণে নববর্ষের এদিনটির জন্য অপেক্ষা করতে হয় উভয় দেশে বসবাসকারী লোকজনকে। সাক্ষাতের সময় সামর্থ্য অনুযায়ী তারা একে অপরকে দেয় নানা উপহার সামগ্রী।
ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার ভক্তিনগর থানার আশিঘর থেকে মাকে দেখতে এসেছেন ফুলমতি (৪০)। তার মা সরলা রানী (৮৫) থাকেন পঞ্চগড় জেলা সদরের উত্কুড়া বানিয়াপাড়া গ্রামে।
সরলা রানী জানান, ২০ বছর আগে মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। বিয়ের পরই জামাই মেয়েকে নিয়ে ভারতে চলে যায়। এরপর থেকে আর মেয়ের দেখা নেই। ২০ বছর পর মা-মেয়ের দেখা হওয়ার পর তারা কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার কোতোয়ালী থানার কনপাখুরী থেকে এসেছেন তফাজউদ্দিন (৬৫)। তার বড় বোন হামিদা খাতুন (৭০) থাকেন পঞ্চগড় জেলা সদরের মোলানী বোদাপাড়া গ্রামে। ভাই-বোনে দেখা হলো দীর্ঘ ১৮ বছর পর।
এ ব্যাপারে পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল হক বলেন, উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের সহযোগিতায় অমরখানা সীমান্তে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে দুই বাংলার নাগরিকদের মিলনমেলা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শুরুতে বিএসএফ রাজি না থাকলেও দেশের নাগরিকদের চাপে শেষ পর্যন্ত তাদের বেড়ার কাছে আসতে দেয়। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি রক্ষায় সীমান্তে পর্যাপ্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন ছিল।
ঠাকুরগাঁও সীমান্তে মিলনমেলা
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে প্রতিবারের ন্যায় এবারও বসে দুই বাংলার মিলন মেলা, যদিও মাঝে ছিল কাঁটাতারের বেড়া। বুধবার ঠাকুরগাঁও ধনতলা, হরিপুর উপজেলার ডাবরী সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ডে ঠাকুরগাঁও ৩০ বিজিবি ব্যাটালিয়ান ও ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের উদ্যোগে এ মিলন মেলার আয়োজন করা হয়। এদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও বালিয়াডাঙ্গী ধনতলা ও হরিপুর উপজেলার ডাবরী সীমান্তের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাংলাদেশ ও ভারতের হাজার হাজার মানুষ আসে আপনজনদের সাথে দেখা করতে।
