সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে প্রতিরাতে আমরা ঘরে ফিরি আমাদের প্রিয় মুখগুলোর কথা চিন্তা করে। যতই কলহ-বিবাদ হোক না কেন দিন শেষে বাবা-মা’র কথা, প্রিয়জনের কথা কিংবা সন্তানের কথা আমাদের মনে পড়ে যায় এবং হাতের মুঠোফোনটি থেকে একটি ‘কল’ বা ‘সরি’ লিখে ছোট্ট একটি মেসেজ প্রিয় নম্বরটিতে যাবেই।
এই প্রিয়মুখগুলোর জন্যই আমাদের বেঁচে থাকার উদ্দীপনা, প্রতিদিনের সংগ্রাম এবং আমাদের স্বপ্ন দেখা। কিন্তু আমরা কি এই স্বপ্নগুলোর মাঝে কখনও দুঃস্বপ্ন দেখি? কখনও কি ক্লান্ত হয়ে পড়ি প্রিয়মুখগুলোর জন্য বেঁচে থাকার উদ্দীপনায়? নাকি যাদের জন্য আমাদের স্বপ্ন দেখা তারাই এই স্বপ্নগুলো ভেঙে দেয়? ভাঙা স্বপ্নগুলোকে আবার নতুন করে জোড়া দেয়া সহজ হয়ে ওঠে না।
আর সেই সময় ভালোবাসার আবেগটি ক্রোধে রূপান্তরিত হয় ঠিক তার জন্য, যার জন্য একসময় আমরা এমনটি চিন্তাও করতে পারতাম না! সবকিছুরই একটি ভয়ঙ্কর সত্য থাকে। ভালোলাগার মানুষগুলোর ক্ষেত্রেও এমন হিতে বিপরীত হয়ে থাকে আমাদের এই অদ্ভুত জীবনে!
আ’-সঙ্গীত গায়ক গ্যাইয়ে, (এপ্রিল ১, ১৯৮৪)
সবসময় আমরা বিশ্বাস করে থাকি, বাবা-মা’র জন্য সবচেয়ে হূদয় বিদারক তার সন্তানটির মৃত্যু। কিন্তু আমাদের একটু সময় নিতে হয় যখন আমরা শুনি বাবা কিংবা মা তার নিজ সন্তানটির হত্যাকারী। যদিও এই বাক্যটি বিশ্বাস করা কোনো বাজে স্বাদের তেঁতো ওষুধ গেলার মতই লাগে। তারপরেও এমন কিছু কাহিনি আমরা কেবল নির্বিকার শ্রোতা রূপেই শুনে যাই।
আ’-সঙ্গীত গায়ক মারভিন গ্যাইয়ে, যিনি আমাদের ‘আই হিয়ার্ড ইট থ্রু দ্য গ্রেপভাইন’, ‘লেটস গেট ইট অন’ এর মতো বেশকিছু সুন্দর গান উপহার দিয়েছেন। তার মৃত্যুর সংবাদটিও আমাদের জন্য এক বিস্ময়কর ঘটনা ছিল। মারভিন তার সমগ্রের ১০টি আ’-সঙ্গীতের জন্যে সঙ্গীত জগতের সবচেয়ে বড় অর্জন ‘গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন ১৯৮২ সালে। দু’বছরের মাঝে খ্যাতির এই অর্জন মারভিনের জন্য বিড়ম্বনা বৈ আর কিছুই ছিল না।
মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় স্পটলাইটের পরিবর্তে অসুস্থ মারভিনের স্থান হলো তার বাবা-মা’র সাথে, লস এঞ্জেলেসে। ৩১ এপ্রিল রাত ১১টা ৪৫মিনিটের দিকে মারভিনের মা রান্নাঘরে ছেলের জন্য কেক বানাচ্ছিলেন, কেননা কিছুক্ষণ পরেই মারভিনের ৪৫তম জন্মদিন উদযাপন করবেন তিনি।
মারভিন এবং তার বাবা ‘মারভিন গ্যাইয়ে সিনিয়র’-এর মধ্যকার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুনতে পেলেন তিনি, যা হরহামেশাই হচ্ছিলো বাবা-ছেলের মাঝে।
মারভিনের মা হয়তো ঘুনাক্ষরেও ভাবেননি কিছুক্ষণের মাঝেই তিনি গুলির শব্দ শুনতে পাবেন। যখন অপ্রত্যাশিত শব্দটি শুনে তিনি ছুটে বেরিয়ে এলেন তখন দেখতে পেলেন ‘জন্মদিনের ছেলেটি’ মারভিন মেঝেতে পড়ে রয়েছে আর তার পাশেই তার স্বামী ‘এ.৩৮’ পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। হয়তো এটাই ছিল মারভিনের ৪৫তম জন্মদিনের সবচেয়ে বিস্ময়কর এক ঘটনা!
মারভিন কি কখনও ভাবতে পেরেছিলেন তার সেই বাবা-ই তার জন্মদিনে তাকে মেরে ফেলতে পারে! যে কি-না তার অন্য জন্মদিনগুলোতে সবচেয়ে সুন্দর উপহারটি দিয়ে অবাক করে দিতে চেয়েছিলেন!
অভিনেত্রী ডোমিনিক ডান্নে (নভেম্বর ৪, ১৯৮২)
১৯৮২ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে স্টিভেন স্পিলবারগের থ্রিলার ‘পল্টারজিস্ট’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে সাড়া ফেলে দেন আমেরিকান অভিনেত্রী ডোমিনিক ডান্নে। ডান্নে ছিলেন লেখক, চলচিত্র প্রযোজক এবং সাংবাদিক ‘এলেন গ্রিফিন’-এর মেয়ে।
সর্বপ্রথম রূপালিপর্দায় তার অভিষেক ঘটে ১৯৭৯ সালের চলচিত্র ‘ডায়েরি অফ এ টিনেজ হিচিকার’-এর মধ্য দিয়ে।
এর এক বছরের মাথায় ডান্নে অনেক বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন বিভিন্ন টিভি শো ‘হার্ট টু হার্ট’,‘ফেম’, ‘লো গ্রান্ট’-এর অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তার অভিনয় সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয় থ্রিলার ‘পল্টারজিস্ট’-এ।
অল্প সময়ে এত বেশি জনপ্রিয়তা ডান্নে উপভোগ করতে পারেননি খুব বেশি সময়। পল্টারজিস্ট সম্প্রচারের মাত্র ৪ মাসের মাথায় নভেম্বর, ১৯৮২-তে ডান্নে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে কমায় চলে যান তার সাবেক প্রেমিক ‘জন থমাস’-এর দ্বারা। থমাসের সাথে ডান্নের সম্পর্ক মাত্র কয়েক সপ্তাহব্যাপী ছিল। থমাসকে ওয়েস্ট হলিউডের জেলে সাড়ে ৬ বছরের সাজা দেয়া হয়।
ডরোথি স্ট্রেটাট্টেন (আগস্ট ১৪, ১৯৮০)
প্লেবয় মডেল ডরোথি স্ট্রেটাট্টেন তার অল্প সময়ের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার জীবনের সমাপ্তি টানেন তার স্বামী পল ক্লাইডারের হাতে।
ডরোথি রুথ স্ট্রেটাট্টেনের জন্ম ১৯৬০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, ভাঙ্কুভার শহরে। সোনালি চুলের ডরোথি তার স্কুলের সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বরাবরই প্রথম হতেন। পেশা হিসেবে তিনি তাই মডেলিংকে বেছে নেন।
১৯৭৯ সালে ডরোথির সৌন্দর্য এবং খ্যাতি অধিক পরিচিতি পায় ‘প্লেবয়’ অনুষ্ঠানটিতে মডেলিং-এর মাধ্যমে। সে বছরই ডরোথি ‘স্কেটটাউন’, ‘ইউএসএ’, ‘এমেরিকাথন’-সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। এই উদীয়মান তারকা দীর্ঘসময় প্রণয়ের পর সেই বছরই চলচ্চিত্র প্রযোজক ক্লাইডারের সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। কিন্তু সংসার জীবনে ডরোথি-ক্লাইডার সুখী ছিলেন না।
মাত্র এক বছর পরেই ১৯৮০ সালে ডরোথি আদালতে নির্যাতনের জন্য ক্লাইডারের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ চান। কিন্তু ক্লাইডার বিবাহ বিচ্ছেদের বিপরীতে ছিলেন।
এ নিয়ে ডরোথি-ক্লাইডার জুটির মাঝে অনেক বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে ক্লাইডার ডরোথির মাথায় শটগান দিয়ে গুলি করেন এবং নিজেও একইভাবে আত্মহত্যা করেন।
ডরোথির মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে দু’টি চলচ্চিত্র নির্মাণ, বেশকিছু গান ও ‘জেমি লি কারটিসের’, ‘ডেথ অফ এ সেন্টারফোল্ড’-সহ কিছুসংখ্যক বই লেখা হয়।
আমরা হয়তো ব্রায়ান অ্যাডামসের ডরোথির জন্যে গাওয়া ‘দ্য বেস্ট ওয়াস ইয়েট টু কাম’ গানটি শুনি, কিন্তু ক্ষণিকের তারকা ডরোথির কথা খুব একটা জানি না!
অভিনেতা ফিল হার্টম্যান (মে ২৮, ১৯৯৮)
আমেরিকান অভিনেতা ফিল হার্টম্যান এখনও বেঁচে আছেন তার অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। হার্টম্যানের অভিনীত শ্রেষ্ঠ টিভি সিরিয়াল ‘স্যাটারডে নাইট’ ও ‘রেডিও নিউজ’। তার পরিচিত কণ্ঠস্বরটি আমাদের কাছে পরিচিত হয়েছে জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল ‘দ্য সিম্পসন’-এর কয়েকটি চরিত্রের মাধ্যমে।
হার্টম্যান ও তার স্ত্রী ‘ব্রীন হার্টম্যান’-এর ১১ বছরের দাম্পত্য জীবন সুখের হলেও ব্রীন একসময় মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। অতিরিক্ত মাদক ব্যবহারের ফলে ব্রীন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ায় বিচ্ছেদ চাচ্ছিলেন। ফিল বিচ্ছেদে রাজি না থাকায় অসুস্থ ব্রীন গভীর রাতে তার নিজস্ব ‘স্মিথ এন্ড অয়েসসন.৩৮’ দিয়ে ঘুমন্ত ফিলের মাথায় দু’টি গুলি করেন।
ফিলকে খুন করার পরদিন সকালে ব্রীন তার এক বন্ধুকে ফোন করে স্বীকার করেন যে তিনি তার স্বামীকে মাঝ রাতে খুন করেছেন।
এরপর তিনি তার দুই সন্তানকে শেষ বারের জন্য দেখে এসে বিছানায় ফিলের মৃতদেহের পাশে বসে নিজ মুখে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। যখন তাদের লাশ উদ্ধার করতে যাওয়া হয় তখন মৃত ফিল ও ব্রীনকে একইসাথে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ব্রিনের এই মাদকাসক্তের জন্য পরবর্তীতে তার মানসিক রোগের চিকিত্সক ‘ফাইজার’কে অভিযুক্ত করা হয়, কেননা তিনিই ব্রীনকে মাদকাসক্ত হওয়া সত্ত্বেও কড়া মাত্রার ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিচ্ছিলেন।
যে বাড়িতে এই জুটি মারা যায় সেই বাড়িতেই তারা তাদের ১১ বছরের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো কাটিয়েছেন তাদের দুই সন্তানের সাথে।
বনি লি ব্যাকলে (মে ৪, ২০০১)
কিছু সময়ের জন্যে গুঞ্জনের বাইরে থাকলেও ‘ইন কোল্ড ব্লাড’ এবং ‘বারেট্টা’ চলচ্চিত্রের প্রধান অভিনেতা ‘রবার্ট ব্লেক’ আবারও পত্রিকার কভার পেজে আসেন তার স্ত্রী ‘বনি লি ব্যাকলে’কে হত্যার ঘটনায়। আমেরিকান অভিনেত্রী বনি লি ব্যাকলে তার অভিনয়ের জন্য যতটা না পরিচিত ছিলেন তার চেয়েও বেশি পরিচিত ছিলেন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে। তৎকালীন সময়ে পত্রিকার কভারগুলোতে লি ব্যাকলের স্থান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য হলেও এ নিয়ে ব্যাকলে ততটা চিন্তিত ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে অর্থ ডাকাতি, অপহরণ’সহ অনেক মামলা থাকলেও সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ছিল তার ভিন্ন ভিন্ন ৩০টি পরিচয়পত্র থাকার মামলাটি।
১৯৯৯ সালে ব্যাকলে ৬ মাসের জন্য জেলও খাটেন। এরপর আবার অভিনয় জগতে পদার্পণ হলে ব্যাকলের পরিচয় হয় অভিনেতা রবার্ট ব্লেকের সাথে। তারপর ১ বছর প্রণয়ের সূত্র ধরে তাদের দাম্পত্য জীবন। ব্যাকলে তার অতীতের কার্যকলাপ কোনোভাবেই ছাড়তে পারছিলেন না।
এজন্য রবার্টও যে তাকে খুব একটা সহায়তা করেছিলেন তা নয়। দাম্পত্য জীবনের প্রথমবার্ষিকী উদযাপনের জন্যে ৪ মে এই জুটি নিউজার্সির একটি রেস্টুরেন্টে যান এবং সেইদিনই রবার্ট ব্যাকলেকে গুলি করে খুন করেন।
রবার্টের বিরুদ্ধে সেই বছরই মামলা হয়, কিন্তু নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় রবার্ট কয়েকমাসের মধ্যেই জেল থেকে ছাড়া পান। ২০০৫ সালে রবার্টের বিরুদ্ধে আবারও মামলা হয়।
এসময়ে মামলাটি করেন রবার্ট-বাকলে জুটির প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান রোজ এবং এ সময়ে প্রমাণিত হওয়ায় রবার্টের বিরুদ্ধে ব্যাকলে হত্যার জন্যে ৩০মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়।
বাবার বিরুদ্ধে রোজ নিজে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন যে রবার্ট নিজেই তার মা ব্যাকলের মাথায় গুলি করে সেখান থেকে পালিয়ে যান এবং রোজ তার শৈশবের দিনগুলোতে অন্য এক বাবাকে দেখেছিলেন যে এখন আর তার কাছে কোনো গুরুত্ব রাখে না।
