ঢাকায় সিটি করপোরেশন উত্তর-দক্ষিণ নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের প্রচারণার সময় ফুরিয়ে আসছে। আছে আর মাত্র ৯ দিন। প্রার্থীদের যখন নাওয়া-খাওয়ার ফুরসত্ নেই, তখন জনসংযোগে মাঠে নেই বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা! গ্রেফতার আর অপহরণ আতংক তাদের ঘিরে রেখেছে।
মামলা না থাকলেও আটকের আশংকায় এখন অব্দি নির্বাচনী প্রচারণার মাঠেই নামতে পারেননি বিএনপি ও তাদের জোটের শরিক দলের অধিকাংশ প্রার্থী। জামিনের জন্য তারা আদালতেও যাচ্ছেন না ভয়ে। অনেকে অপেক্ষায় ছিলেন মির্জা আব্বাসের জামিন হয় কি না তা দেখার জন্য। তার জামিন না হওয়ায় কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিরাশ হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে যে সব কাউন্সিলর প্রার্থী মাঠে নেমেছিলেন গত বৃহস্পতিবার প্রচারণার সময় ঢাকা উত্তরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী এ এল এম কাওছার আহমেদকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর তারা আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা আবারো আত্মগোপনে গেছেন।
কারণ এ এল এম কাওছার আহমেদের নামে থানায় কোন মামলা ছিল না বলে তিনি নির্বাচনী হলফনামায় জানিয়েছিলেন। তবে পুলিশ গ্রেফতারের পর বলেছে, তার নামে মামলা আছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে সাইদুর রহমান নামে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ঢাকা উত্তরের ২৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীকে পুলিশ আগারগাঁও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে থেকে আটক করেছিল।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, বিরোধী জোট সমর্থিত ৫৪ জনের বেশি কাউন্সিল প্রার্থী তাদের হলফনামায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এদের মধ্যে একজন ৪৭টি মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে হত্যা এবং হত্যাচেষ্টার মামলায় অভিযোগপত্রও দেয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণের ৫ নং ওয়ার্ডের জোটের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হামিদুল হক বলেন, আমার বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা আছে। সবগুলো রাজনৈতিক। ঘর ছাড়া হয়েছি অবরোধ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই। প্রচারণা চালাবো কি করে। তবে দলের নেতাকর্মীরা আমার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছেন। অপর একজন প্রার্থী বলেন, গ্রেফতারের চেয়ে গুম হওয়ার ভয় বেশি। তাই পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার মতো বিএনপি সমর্থিত বেশির ভাগ কাউন্সিলর প্রার্থি গুমের আশংকায় পালিয়ে আছেন। তারা নির্বাচনের মাঠে নামতে পারছেন না। তাদেরকে প্রচারণায় নামলে ‘ক্রসফায়ারে’ দেয়ার হুমকিও দেয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ সিটির ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুল হক জানান, বিএনপি সমর্থিত কোন প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় নামলে প্রতিপক্ষ পুলিশকে খবর দিচ্ছে। পুলিশ এসে গ্রেফতারের জন্য ধাওয়া করছে। তিনি বলেন, আমি দুই দিন জনসংযোগে নেমে পুলিশের তাড়া খেয়েছি। এখন আত্মগোপনে আছি। আমার কর্মীরা মাঠে কাজ করছে।
৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী গোলাম হোসেনের নামে মামলা আছে ১২টি। তিনি জানান, এগুলো সব রাজনৈতিক মামলা। ১১টিতে তিনি জামিনে আছেন। একটিতে জামিন না পাওয়ায় তিনি গ্রেফতারের ভয়ে নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারছেন না। তার বাড়িতে গিয়ে পুলিশ খুঁজছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা সমন্বয়ের জন্য গঠিত দক্ষিণের আহবায়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ প্রার্থীদের বিনা কারণে হয়রানি না করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রতি নির্দেশনা দিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পুলিশ আমাদের প্রার্থীদের মাঠে নামতে দিচ্ছে না। নামলেই ধাওয়া করছে গ্রেফতারের জন্য। তাদেরকে জনসংযোগে এলাকায় ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। বিপরীতে ভোটের মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটের শরিক দলের প্রার্থীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিএনপি জোটের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা চাঙ্গা করা হচ্ছে। জামিন দেয়া হচ্ছে না। অথচ সরকারি জোটের প্রার্থীদেরকে আগের মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। হান্নান শাহ অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনকে বার বার বলা সত্ত্বেও তারা সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে পারেনি। কমিশন অভিযোগ আমলেই নিচ্ছে না। অবিলম্বে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানান তিনি।
১৬ কমিটি গঠন করেছে ২০ দল
ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের নির্বাচন তদারকির জন্য ৮টি করে মোট ১৬টি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি নির্বাচনের দিন ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রের পাহারায় থাকবে। এ ছাড়া এ কমিটি প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যবেক্ষণ করবে। গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ এবং গুলশান কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সভাপতিত্বে নির্বাচন সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এই কমিটি করা হয়।
পল্টনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির আলতাফ হোসেন চৌধুরী, নিতাই রায় চৌধুরী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ডিএল মহাসচিব সাইফুদ্দিন মনি, গুলশানে সমন্বয় কমিটির বৈঠকে অংশ নেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহমুদুল হাসান, শওকত মাহমুদ, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহীম, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, এনডিপির চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মর্তুজা, বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি, এলডিপির যুগ্ম-মহাসচিব সাহাদত হোসেন সেলিম প্রমুখ।
নির্বাচন সমন্বয় কমিটিতে জামায়াত নেই
ঢাকা দক্ষিণের বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের জন্য ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে গঠন করা সমন্বয় কমিটিতে জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রতিনিধি নেই। মাত্র ৬টি দলের প্রতিনিধি রয়েছেন কমিটিতে। এ বিষয়ে আ.স.ম হান্নান শাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ২০ দলীয় জোটের অন্যান্য দলের কাছ থেকে নাম চেয়েছি। এখনো অনেকে নাম জমা দেননি। তবে দ্রুত আমরা তাদের নাম পেয়ে যাবো। এদিকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত বিএনপির অনেক নেতাই এখন কারাগারে ও বিদেশে অবস্থান করছেন।
সিটি নির্বাচন সরকার ও ইসির অগ্নিপরীক্ষা’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ সমন্বয় কমিটির বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের বলেন, আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য অগ্নিপরীক্ষা।
এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হবে দেশে গণতন্ত্র আছে কিনা, ইসি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কিনা। আমরা বিশ্বাস করি, এই সিটি নির্বাচনে ইসি যদি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে তাহলে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট সমর্থিত সব প্রার্থীই বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। আন্দোলনকে জোরদার করতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অংশ নিয়েছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা নির্বাচনে আছি এবং শেষ পর্যন্ত থাকবো।