ঘুরে দাঁড়ানোর অবিরাম সংগ্রামে আহতরা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৫, ০১:৪৩

রানা প্লাজার ৬ তলার ইথারটেক্স-এ কাজ করতেন জাকিয়া বেগম। ভবন ধসের ২দিন পর আহত অবস্থায় উদ্ধার পান তিনি। ধীরে ধীরে সুস্থ হলেও আর ফিরে যাননি গার্মেন্টসের কাজে। উদ্ধার পাবার পর সহায়তার সামান্য অর্থে গড়ে তোলা একটি ছোট মুদি দোকানের আয়ে দু’সন্তান আর স্বামীকে নিয়ে চলছে তার জীবন। দুঃসহ সেই স্মৃতি মনে করে তিনি বললেন, “আর কোন দিন গার্মেন্টেস এ কাজ করবো না”।

 
২২ বছর বয়সী সিদ্দিক তিনদিন পর ধসে পড়া ভবন থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর আর ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। কোন বড় ভবনে প্রবেশ করলেই এখনও আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। জীবিকার তাগিদে ফের পোশাক কারখানায় কাজ নিলেও বেশিদিন কাজ করতে পারেননি। জানালেন, একটানা বসে থাকলেই মেরুদন্ডে ব্যথা শুরু হয়। ভীষণ অস্থির লাগে।
 
ভয়াল সেই রানা প্লাজা ধসের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামী ২৪ এপ্রিল। ওই দুর্ঘটনায় মারা যান অন্তত ১ হাজার ১৩৮ শ্রমিক। এই বাইরে বেশকিছু শ্রমিকের হদিসই পাওয়া যায়নি। মারাত্মক আহত হন কমপক্ষে এক হাজার শ্রমিক। তাদের অনেকে এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের অনেকেই এখনো শারীরিক ও মানসিক ‘ট্রমায়’ আক্রান্ত। এসব আহত শ্রমিকদের একটি অংশ গ্রামে চলে গেলেও বেশিরভাগই সাভার ও এর আশপাশের এলাকায় থাকেন। সাভার বাজার সংলগ্ন এলাকায় এখনও দেখা মেলে সেইসব শ্রমিকদের। তাদের মধ্যে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন জীবিকার তাগিদে। তাদের কেউ ছোট মুদি দোকান চালাচ্ছেন, কেউ স্বল্প পুঁজির হস্তশিল্প, টেইলরিং শপ, মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রি বা রিচার্জের দোকান দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
 
সম্প্রতি রানা প্লাজা সংলগ্ন সাভার এলাকা ঘুরে আহতদের সাথে কথা বলে এমনটিই জানা গেছে। মানসিক চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা এ শ্রমিকদের অনেকেই এখনও স্বাভাবিক হতে পারছেন না। তাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চিকিত্সা।
 
সাভারের ভাটিপাড়ায় নুরজাহান বেগম এখনও পায়ে আঘাতের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি জানালেন, এখনও তাকে চিকিত্সা নিতে হচ্ছে। ভারি কাজ করতে পারেন না তিনি। স্বামীর ছোট ব্যবসায় সাহায্য করে দিন চলছে তাদের। এরকম অনেকেই অন্য পেশায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ স্বল্পপুঁজিতে ছোটখাটো কারখানাও স্থাপন করেছেন। কথা হয় সেরকমই একজন উদ্যোক্তা আহত শ্রমিক নাসিরের সাথে। সুস্থ হয়ে ওঠার পর নাসির সাভারের ভাটপাড়া এলাকায় দুস্থ শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের একটি ঘর ভাড়া নেন। এরপর নাসির ও তার এক বন্ধু মিলে মাত্র দুই লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে ৮টি  সেলাই মেশিনকে সম্বল করে ছোট কারখানা চালু করেন। এখানে নিযুক্ত ছয়জন শ্রমিকই রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত। এরকম অনেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সামনের দিকে এগুতে পারছেন না।
 
আহত গার্মেন্টস কর্মী শাহজাহান সেলিম এখনও চিকিত্সা নিচ্ছেন। সেলিম জানালেন, দুর্ঘটনার দিন অক্ষত অবস্থাতেই বের হতে সক্ষম হন তিনি। এরপর তিনি উদ্ধার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। উদ্ধারকর্মী হিসেবে ২৮ জনকে মৃত ও ৩৭ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন তিনি। কিন্তু উদ্ধার কাজের এক পর্যায়ে দুর্ঘটনায় কোমরের হাড় ভেঙে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যান সেলিম। কিন্তু দমে যাননি। হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। ক্রাচে ভর দিয়ে স্বপ্ন দেখছেন স্বাবলম্বী হবার।
 
বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা প্লাজার আহত শ্রমিকদের উন্নয়নে কাজ করছে। বাংলাদেশে একশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির জানালেন, আইএলওর সহায়তায় একশন এইড আহত শ্রমিকদের উন্নয়নে বিভিন্ন কাজ করছে। প্রায় ২৬০ জন শ্রমিককে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
 
তবে আহতদের অভিজ্ঞতা হলো, রানা প্লাজা ধসের পর সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শুরুতে যেভাবে এগিয়ে এসেছিল, সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে আসছে। আহত শ্রমিকরা বিভিন্ন সময়ে অর্থসহায়তা পেলেও তাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা। প্রয়োজন পরিকল্পিত সহায়তা।
 

সমপ্রতি রাজধানীর মহাখালীর ব্র্র্র্যাক সেন্টারে রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থার উপর একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব উদ্যোক্তা শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে একটি তহবিল গঠন করা যেতে পারে। ওই তহবিল থেকে যাতে তারা নামমাত্র সুদে ঋণ পেতে পারেন।