নারায়ণঞ্জের আলোচিত স্কুল-ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পার হলেও তদন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি র্যাব। এ হত্যাকাণ্ডে দুই জন নিজেদের সম্পৃক্ত করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। অথচ তাদের জবাবনবন্দিতে কোনো মিল নেই। আরো কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। র্যাব কর্মকর্তারাও বলছেন—সব কিছু দেখে-শুনে নিশ্চত হয়ে চার্জশিট দিতে একটু সময় লাগছে।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে—২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকাল ৪টার দিকে তানভীর মুহম্মদ ত্বকী নিখোঁজ হয়। ত্বকীর বাবা ও আত্মীয় স্বজনরা চারদিক খোঁজাখুঁজি করেন। না পেয়ে সন্ধ্যায় ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী নারায়নগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। দুই দিন পর সকাল পৌনে ১০টার দিকে কুমুদিনী জোড়াখালে ত্বকীর লাশ পাওয়া যায়। পরে রাফিউর রাব্বী বাদী হয়ে কারো নাম উল্লেখ না করে একটি হত্যা মামলা করেন।
জানা গেছে—ময়নাতদন্ত রিপোর্টে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক উল্লেখ করেছেন ত্বকীকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে এই মামলাটি পুলিশ তদন্ত করলেও পরে হাইকোর্টের নির্দেশে র্যাবকে তদন্ত-দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর র্যাব এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইউসুফ হোসেন লিটন, সুলতান শওকত ভ্রমর এবং তায়েব উদ্দীন জ্যাকি ও সালেহ রহমান সীমান্তকে গ্রেফতার করে। এর আগে পুলিশ গ্রেফতার করে রিফাত বিন ওসমানকে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে লিটন ও ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
র্যাব কর্মকর্তারাও বলছিলেন—তদন্ত শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। যে কোনো সময় চার্জশিট দেয়া হবে। কিন্তু হঠাত্ করেই ধরা পড়ে খুনিদের জবানবন্দি মিলছে না। কিছু তথ্যেও রয়েছে গড়মিল। ফলে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রথমত, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ভ্রমর বলেছে—নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমিরী ওসমানের অফিসে নিয়ে নির্যাতনের পর ত্বকীকে হত্যা করে লাশ বস্তাবন্দি করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়া হয়।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—নির্যাতনের পর লাশ বস্তাবন্দি করা হলে লাশের পায়ে স্যান্ডেল এল কী ভাবে। আর বস্তা থেকে লাশটি বের হলোই-বা কী ভাবে? আজমিরী ওসমানের অফিস থেকে রক্তমাখা প্যান্ট উদ্ধারের পর বলা হয়েছিল এটি ত্বকীর। অথচ লাশ উদ্ধারের সময় ত্বকীর পরণে জিন্সের প্যান্ট পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয়ত, প্রথম স্বীকারোক্তিমূলক জবাবনবন্দি দেয়া লিটন বলেছে—সালেহ রহমান সীমান্ত নামের এক যুবকের বাড়িতে ত্বকীকে হত্যার পর লাশ বস্তায় ভরে শীতলক্ষ্যার শাখা খালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বস্তা থেকে লাশ বের করে ফেলে দেয়া হয়। এখানে দুই জনের জবানবন্দিতে কোনো মিল নেই। পাশাপাশি, দুই জনেই বস্তার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বস্তা উদ্ধার হয়নি। তাহলে বস্তাটি গেল কোথায়? আর বস্তায় ভরা লাশের পায়ে বেল্ট বিহীন চামড়ার স্যান্ডেল থাকে কী ভাবে? পায়ের চামড়ার স্যান্ডেল থেকেই তদন্তকারীরা ধারণা করছেন—যেখান থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছে, তার আশপাশেই খুন হয়েছেন ত্বকী। আর এ খুন পরিকল্পিত নয়, ঘটনার আকস্মিকতায় হয়ত হত্যাকাণ্ড। তবে কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা হয়ত তদন্তে বের হয়ে আসবে।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘তদন্ত শেষ হয়ে এসেছে। চার্জশিট দিলেই জানা যাবে, কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কারো স্বীকারোক্তিতে যদি অসংলগ্নতা থাকে, তাহলে যাচাই করে দেখা হবে। এই মামলায় র্যাব যখন চার্জশিট দেখে, তখন সবকিছু নিশ্চিত হয়েই দেয়া হবে।
