শ্রমিকের উত্পাদনশীলতা বাড়লে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ। দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি বাড়বে। শ্রমিকদের এখন যে উত্পাদনশীলতা রয়েছে সেটি বাড়িয়ে মাথাপিছু ১০০ ডলার বাড়তি রপ্তানি করতে পারলে বছরে শ্রমিকদের মজুরি ২০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ভারতে বাড়তে পারে ১২ দশমিক ৭ ডলার এবং শ্রীলঙ্কায় বাড়তে পারে ১০ দশমিক ২ ডলার। এর মাধ্যমে গ্রামীণ ও অদক্ষ শ্রমিকরা নতুন কর্মসংস্থানে সুযোগ পাবে। বিশেষ করে নারীদের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হতে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানে নিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের সম্পর্ক নিয়ে করা ‘এক্সপোর্টস টু জবস: বুস্টিং দ্য গেইন ফর্ম ট্রেড ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমনটি তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক ও আইএলও’র করা এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য হারে দরিদ্র্য কমে এসেছে। কিন্তু এই অঞ্চলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীও বাড়ছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও এই অঞ্চলে তার সাথে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ভালো কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হতে কর্মসংস্থানের মূল ধারায় নিয়ে আসায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে গত দশ বছরের কর্মসংস্থান ও মজুরি নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, রপ্তানি বৃদ্ধির সাথে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সাথে কর্মসংস্থানের মিল নেই। ফলে ‘সাউথ এশিয়ান প্যারাডক্স’ ও ‘জবলেস গ্রোথ’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, গত বছর এই অঞ্চলে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে এবং এবছর ৭ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এই দশবছরে এই অঞ্চলে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ১ থেকে কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে ঠেকেছে। অর্থাত্ খুব ধীরে কমছে বেকারত্বের হার। এত প্রবৃদ্ধির পরেও এই অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ১২ ভাগ মানুষের আয় ১ দশমিক ৯ ডলারের নিচে। বিশ্বের প্রতি তিনজন দরিদ্র্যের আবাস এই দক্ষিণ এশিয়া। এজন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়লে এর প্রভাব অন্যান্য খাতেও পরে। অদক্ষ শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেশি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মজুরি এখনও কম। তাই উত্পাদনশীলতা বাড়লে মজুরি বৃদ্ধির হার বাংলাদেশেই বেশি হবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানির পরিমাণ জিডিপির তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশের সমান। অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার ২০ শতাংশ এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার ৩০ শতাংশ। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রমের মজুরিও কম। চীনা শ্রমিকদের তুলনায় অর্ধেক বা এক-চতুর্থাংশ মজুরি পাচ্ছে এই অঞ্চলের পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। যদিও দক্ষিণ এশিয়ার গার্মেন্টস রপ্তানি বাড়ছে। চীনের পরেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারন দেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫৬ ভাগ। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বাড়তি ৩ কোটি ৪০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। অথচ এদেশে ৮৫শতাংশ কর্মসংস্থানই অপ্রাতিষ্ঠানিতক খাতে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার এই বোনাসকে কাজে লাগাতে হলে নারীদের কর্মসংস্থানের মূল ধারায় নিয়ে আসতে হবে।
