কংগ্রেসের হাতেই থাকবে নিয়ন্ত্রণ

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৫, ১১:৪৭
 
মার্কিন নাগরিক হাওয়ার্ড এফ জ্যাকেল। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বিভাগে একটি চিঠি লিখেছেন ইরানের পরমাণু ইস্যুতে। তিনি মূলত চিঠিটি লিখেছেন কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সমঝোতায় আসা প্রসঙ্গে। সমঝোতা অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে এখন পরমাণু চুক্তি হলেও সেটা ভবিষ্যতে পর্যালোচনা করতে পারবে কিংবা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে কংগ্রেস। চুক্তি করার পর সিনেটে উপস্থাপন করতে হবে এবং পক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেতে হবে। যেমন হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির বেলায়। এটা খারাপ হতো যদি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নির্বাহী আদেশবলে চুক্তির অনুমোদন দিতেন। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কোনো চুক্তি হলে নির্বাহী আদেশে করলেও কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সেইভাবে সিদ্ধান্ত নেয়াটা খুব বেশি ভাল হতো না। তার মতে, একটা বিষয় স্মরণ করা প্রয়োজন যে, ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, সুপ্রিম লিডার (সর্বোচ্চ নেতা) নন।
 
গত ১৪ এপ্রিল মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটিতে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা একটি দ্বিপাক্ষিক বিল উত্থাপন করেন। এই বিলে ওবামা এর আগে ভেটো দেয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু ওইদিন ওবামা তার আপত্তির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। এর ফলে কমিটিতে বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এখন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে শিগগিরই পাস হতে পারে। বেশ কয়েকদিনের ধারাবাহিক আলোচনার পর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তির  (রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য) গত ২ এপ্রিল সমঝোতা হয়। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। প্রাথমিক চুক্তিতে ইরানকে অনেক ছাড় দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে বিরোধী রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেস। তারা বলছেন, সমঝোতা অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে অবরোধ আরোপের কথা আছে। আর এক্ষেত্রে কংগ্রেসেরও কিছু করণীয় আছে বলে মনে করেন রিপাবলিকানরা। এমনকি ওবামার দল ডেমোক্র্যাটদের অনেকেও রিপাবলিকানদের সঙ্গে সুর মিলায়। তাইতো কমিটির চেয়ারম্যান এবং রিপাবলিকান সমর্থক বব ক্রোকার বলেছেন, কংগ্রেসের কারণে বাধ্য হয়েই প্রেসিডেন্ট ওবামা তার মত পরিবর্তন করেছেন। তবে প্রথমদিকে যেভাবে বিলটি প্রস্তুত করা হয়েছিল তাতে কিছুটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয় ওবামার দল। এর ফলে ওবামা মনে করছেন, এটা মেনে নিলে কোনো সমস্যা হবে না। প্রথমদিকে বিলটিতে ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হলে কংগ্রেস ৬০দিন পর্যন্ত তা স্থগিত রেখে পর্যালোচনা করতে পারবে। কিন্তু বর্তমান বিলটিতে সেই সময় কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে। এছাড়া পরমাণু কর্মসূচিতে সীমিত করার বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে কিনা সেই বিষয়ে কংগ্রেসে ভোটাভুটি করতে হবে।
 
সমঝোতা অনুযায়ী, চুক্তিটি ব্লক করার জন্য কংগ্রেস ৩০ দিন সময় পাবে। কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে ভেটো প্রদানের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসাবে ওবামা সময় পাবেন ১২দিন এবং অতিরিক্ত দশ দিন থাকবে কংগ্রেসের জন্য। এই সময়ের মধ্যে ওবামার ভেটোকে বাতিল করতে হবে। অর্থাত্ প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা বাতিল করতে হলে কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জিততে হবে। সিনেটর ক্রোকার কিন্তু খুব বেশি তাড়াহুড়ো করেননি। তিনি সময় নিয়েই তার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন এবং সেটা করেছেন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তির সমঝোতার পর। মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ইউএসএ টুডেতে ইরানের পরমাণু সমঝোতা ইস্যুতে কংগ্রেসের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সমঝোতা নিয়ে এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস-কংগ্রেস সমঝোতার অর্থ এই নয় যে, ইরানের পরমাণু ইস্যুতে সব বিতর্কের অবসান হলো। কারণ এই যে সমস্যা সেটা ঐতিহাসিক, স্পর্শকাতর। আগামী ৩০ জুনের আগে এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনো কিছু বলা যাবে না। এই তারিখের মধ্যে ইরানের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে চুক্তি করার শেষ দিন।
 
যদিও ওবামা আশা প্রকাশ করছেন যে, চুক্তিটি হলে তা অবশ্যই ভাল হবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ঝুঁকি থেকে বিশ্বকে নিরাপদ করবে। ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে পিছিয়ে দেবে। এই চুক্তি ইরানকে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং বিশ্ব সমপ্রদায়ের সঙ্গে একীভূত হবে। একটি যুদ্ধের সম্ভাবনা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করবে। ইরানের আগ্রাসন থেকে পুরো অঞ্চলকে নিরাপদ করতে সক্ষম হবে। তবে চুক্তি নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। আর মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে লেখা এক নিবন্ধে এই সংশয় প্রকাশ করেছেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং জর্জ শুলত্জ।
 
ইউএসএ টুডেতে লেখা কলামে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জামাল আবদি (ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকার কাউন্সিলের পলিসি বিষয়ক পরিচালক) কংগ্রেস-হোয়াইট হাউস সমঝোতাকে দেখছেন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা খাটো করা হিসেবে। তার মতে, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি অবশ্যই কংগ্রেসের পর্যবেক্ষণ করা উচিত। কিন্তু ‘ইরান নিউক্লিয়্যার এগ্রিমেন্ট রিভিউ অ্যাক্ট’ কেবল পর্যবেক্ষণ বললে হবে না, বরং সমঝোতার মাঝে সমঝোতাকারীদের উপর কূটনীতি এবং খেলার নীতি পরিবর্তনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে খাটো করার অতিরিক্ত একটা পদক্ষেপ।