ফোন করে ক্যামেরা পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন এক প্রভাবশালী নেতা। ক্যামেরায় নির্বাচনী প্রচারণার ছবি তোলার পরে মন্তব্য নিতে গেলে সেই নেতা বলেন, ‘ফটোসেশন শেষ অই গিয়ে, এয়া জগই। আর কিছু নাই। টিভিতে ছবি দেয়াই দিও’– ঘটনার কথা বলছিলেন প্রতিষ্ঠিত এক নিউজ চ্যানেলের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান। তিনি বললেন, ওপরে ওপরে মিল কিন্তু ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগে প্রচণ্ড অন্তর্কলহ। আওয়ামী লীগের এই অন্তর্কলহের কথা চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ‘টক অব দ্য টাউন’ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। আ জ ম নাছিরউদ্দিনের প্রতিপক্ষ তাই শুধুমাত্র মনজুর আলমই নন, ঘরের সিনিয়র নেতা এবং তাদের অনুসারীরাও।
শুধু তো মেয়র পদে না, কাউন্সিলর পদেও তীব্র অসন্তোষ রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মাঝে। ঢাকায় উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের প্রতিটি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের একজন করে প্রার্থী দেয়ার বিষয়টি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা গেছে। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে সেটা সম্ভব হয়নি। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই আওয়ামী লীগে একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহিউদ্দিন চৌধুরী, আ জ ম নাছিরউদ্দিন, সাবেক মন্ত্রী আফসারুল আমিন ও আব্দুল লতিফ এমপি এই চারজনের স্নেহধন্য ব্যক্তিরা কাউন্সিলর প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। এরমধ্যে ১০ থেকে ১২টি ওয়ার্ডে একক প্রার্থীকে সমর্থন দেয়া সম্ভব হলেও অন্যগুলোতে প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। অপরদিকে, বিএনপি-ুজামায়াত বেশ গুছিয়ে নিজেদের একজন প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। ফলে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীর সুবিধা পাবে বিএনপি।
এদিকে, আওয়ামী লীগের মত এতটা তীব্র না হলেও বিএনপির মাঝেও রয়েছে এই অন্তর্কলহ। বিএনপি নেতা-কর্মীরা সবাই মনজুর আলমের পেছনে দাঁড়ালেও ২০ দলের নেতা-কর্মীদের খুব একটা দেখা যাচ্ছে না প্রচারণায়। বিশেষ করে জামায়াত-ইসলামি কিছুটা গা বাঁচিয়ে চলছে বলেই জানালেন কর্মী-সমর্থকরা। এদিকে, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও মনজুর আলমের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে না বলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের কর্মী-সমর্থকরা জানালেন। এই দূরত্ব মেটানোর চেষ্টা করেও খুব একটা কাজে আসেনি বলে জানালেন তারা। ফলে মনজুর আলমও নির্বাচনী লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজের ঘর সামলাতে ব্যস্ত।
ফলে দেখা যাচ্ছে এই অন্তর্কলহ তাদের জয় পরাজয়ের ক্ষেত্রে একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। নানামুখি টানাপোড়েনে দুই শিবিরেই পোলিং এজেন্ট বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে আস্থার সংকট। এবারের নির্বাচনে ৭১৯টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ৯০৬টি বুথে পোলিং এজেন্ট নিয়োগে বিশ্বস্ত লোক নির্বাচনে দেখা দিয়েছে সমস্যা।
এবারের চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আ জ ম নাছিরউদ্দিনের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন সাবেক তিনবারের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু দলের হাই কমান্ড দলের প্রতি নিবেদিত নবীন নেতা নাছিরকে সমর্থন দেয়ায় চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় রাজনীতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রভাব বলয় হারানোর আশংকা থেকেই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অসহযোগিতা করছেন নাছিরকে। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে আসার কারণে প্রতিটি ওয়ার্ড, থানা কমিটিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরাই অবস্থান করছেন। যদি নাছির মেয়র হন তাহলে চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। নাছিরের অনুসারীরাই তখন প্রতিটি কমিটিতে, সিটি কর্পোরেশনের ঠিকাদারিসহ সবকিছুতেই প্রাধান্য পেতে থাকবে। এটা মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরা কোনভাবেই মেনে নেবে না। তাই মুখে নাছিরকে সমর্থনের কথা বললেও বুকে কিন্তু ভিন্ন কথা। সেখানে দলের চাইতে রাজনীতিতে ব্যক্তিগত অবস্থানই গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আ জ ম নাছিরউদ্দিন নির্বাচিত হলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর রাজনীতি প্রকৃতপক্ষে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের শিষ্য মনজুর আলম নির্বাচিত হলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর তেমন কোন ক্ষতি হবে না। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও তার অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
যদিও মহিউদ্দিন চৌধুরী এসব কথাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, আ জ ম নাছিরউদ্দিনের প্রতি দলের ও আমার সমর্থন রয়েছে। তাকে জয়ী করতে সবাই কাজ করছি। নগরবাসীর আশা-আকাঙ্খার প্রতীক নাছিরকে জয়ী করে চট্টগ্রামের উন্নয়নের সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভোট চাইছি আমিও।
এদিকে, প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন আ জ ম নাছিরউদ্দিন এবং তার অনুসারীরা। নাগরিক কমিটি মূলত নির্বাচনী প্রচারণার ছক সাজাচ্ছে। এই প্রচারণায় বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা খুব একটা জোরেশোরে কাজ করছে না বলে অভিযোগ করলেন বেশ কয়েক কর্মী। তারা বলছেন, দলের সবাই মুখে বলছে কিন্তু কাজে আসছে না। এ নিয়ে হতাশাও লক্ষ্য করা গেছে নাছিরের কর্মীদের মাঝে। সেই হতাশা কাটাতেই যেন প্রচারণায় পুরো উদ্যমে ঝাপিয়ে পড়েছেন তারা। পুরো চট্টগ্রামে নাছিরের হাতি মার্কার প্রচারণায় আর সব প্রচারণাই চাপা পড়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু বললেন, যুবলীগের সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ড, থানা কমিটিকে নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠনও তাই করেছে। আ জ ম নাছির নির্বাচিত হলে অনেকেই কমিটিতে অবস্থান হারাতে পারেন এমন আশংকা থেকে কি অনেকেই অসহযোগিতা করছেন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, রাজনীতি সবাই করেন যার যার আদর্শ থেকে। নেতারাও ভালো কর্মী চান। তাই নাছির ভাই নির্বাচিত হলে এমন কোন পদক্ষেপ নেবেন বলে আমরা মনে করি না।
দ্বন্দ্ব এবং দূরত্ব মনজুর আলমের শিবিরেও কম নেই। এবারের ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে জামায়াতকে বিএনপি ১০টি ওয়ার্ড ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু জামায়াতের দাবি ছিল আরো বেশি। সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেয়ায় জামায়াতের মাঝে মনজুর আলমের প্রচারণা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম জামায়াতের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হিসাবে বিবেচিত। সে কারণে তাদের মাঝে এই অসন্তোষ। এছাড়া যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে জামায়াত দল হিসাবেও চাপে রয়েছে। এসব বিষয় নিয়েও অস্বস্তিতে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
এছাড়া ছাত্রদল মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন ডাঃ শাহাদাত হোসেন। তিনি মহানগর বিএনপির সম্পাদক। এবার বিএনপি থেকে মেয়র প্রত্যাশী ছিলেন তিনি। সে কারণে মনজুর আলমের মনোনয়ন পাওয়ায় তিনি এবং তার অনুসারীরা নির্বাচনী প্রচারণায় জোরেশোরে নামছেন না। পাশাপাশি বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপরে নানা ধরনের মামলা রয়েছে। এই মামলার কারণ দেখিয়েও ডাঃ শাহাদাত হোসেনের অনুসারীরা অনেকেই মনজুরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন না। তবে এ প্রসঙ্গে তার অনুসারীরা জানান, মামলার কারণে আমরা গা বাঁচিয়ে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছি।