গৃহস্থালীতে গ্যাস সংযোগ বন্ধের সুযোগে দেশের যেখানে সেখানে অবৈধভাবে এলপিজি সিলিন্ডারের মজুদ গড়ে তুলছেন ব্যবসায়ীরা। ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে সিলিন্ডার বেচাকেনা। শহর কিংবা গ্রাম-সবখানে একই অবস্থা। অনেকস্থানে সাধারণ মুদি পণ্যের মতই চলছে এই জ্বালানির বেচাকেনা। অধিকাংশ দোকানিই বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স ছাড়াই এ ব্যবসা করছেন। এসব দোকানে নেই অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিকারের ব্যবস্থাও নেই।
বর্তমানে দেশে বছরে ৫০ লাখের বেশি এলপিজি-সিলিন্ডার কেনাবেচা হয়। আগামী কয়েক বছরে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ বহুগুণ বাড়বে। এলপি গ্যাস কোম্পানিগুলো জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ডিলারের মাধ্যমে এটি বিক্রি করছে। ডিলাররা আবার খুচরা দোকানে এগুলো বিক্রি করছে। খুচরা দোকানসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ১০টির বেশি সিলিন্ডার থাকলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। কেউ জেনেশুনে এটি মানছেন না, আবার কেউ এ বিষয়ে জানেনই না।
ইত্তেফাকের সিলেট অফিস জানায়, সিলেটে এসব নিদের্শনা অনেকেই মানছেন না। একটি সিলিন্ডার বিক্রয় করলেই ১শ’ টাকা লাভ। যত বিক্রি ততই লাভ। বন্দরবাজার, মহাজনপট্টি, দক্ষিণ সুরমা, সুবহানিঘাট এলাকায় প্রখর রোদে ফুটপাতে মজুদ করে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলার বাজারেও অবৈধভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।
সিলেট জেলায় ৪৮৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে বিস্ফোরক লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে অ্যামোনিয়া গ্যাসের জন্য। সিলেটের বিস্ফোরক পরিদপ্তর অফিস ৪০টি সিলিন্ডারের কম মজুদ রাখে এমন কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয় না। এই সুযোগে অনেকেই কমসংখ্যক সিলিন্ডার দেখিয়ে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আর অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশনা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে সেটি চালানো যাচ্ছে না।
সিলেট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অফিসের সহকারী পরিচালক তন্ময় বিশ্বাস বলেন, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জামাদি ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসা অনেক বিপজ্জনক। খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই ব্যবসা করছেন। সিলেট বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. আলীম উদ্দিন বলেন, বিস্ফোরক লাইসেন্স ১ বছরের মেয়াদে দেওয়া হয়। প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। তালিকা অনুযায়ী শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।
বাংলাদেশে ৭টি কোম্পানি এলপিজি সিলিন্ডার বাজারজাত করে। এ কোম্পানিগুলো মূলত ডিলারের মাধ্যমে তাদের পণ্য বাজারজাত করে থাকে। এসব ডিলার আবার বিক্রি করে ট্রেড লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীদের, যাদের বিস্ফোরক লাইসেন্স নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যাস সিলিন্ডাির বিক্রি করে এমন বেশিরভাগ দোকানির ব্যবসা পরিচালনার সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। কিন্তু ১০টির বেশি সিলিন্ডার মজুদ রেখে বিক্রির ক্ষেত্রে বিস্ফোরক সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও এসব দোকানির সেটি নেই। অথচ তারা ২০টি থেকে শতাধিক সিলিন্ডার মজুদ রেখে দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছেন। দেখা যায়, তারা দোকানের সামনে ১০টির কম সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখছেন। অন্য কোথাও রাখা হয় অনেক বেশি রিলিন্ডার। এই প্রক্রিয়ায় তারা আইনি বাধ্যবাধ্যকতা এড়িয়ে যান।
দেশে সাধারণত এলপিজি উত্পাদনকারী কারখানা থেকে ডিলাররা সিলিন্ডার কেনেন। এরপর খুচরা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সেগুলো ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়। বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪’র ‘দ্য এলপি গ্যাস রুলস ২০০৪’-এর ৬৯ ধারার ২ বিধিতে বলা হয়েছে- ১০ (দশটি) গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদকরণে লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। এর বেশি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদের ক্ষেত্রে লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। একই বিধির ৭১নং ধারায় বলা আছে, আগুন নেভানোর জন্য স্থাপনা বা মজুদাগারে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম মজুদ রাখতে হবে। বলা আছে, এলপিজি স্থাপনা প্রাঙ্গণে ধূমপান, দিয়াশলাই বা আগুন লাগতে পারে এমন কোনো বস্তু বা সরঞ্জাম রাখা যাবে না। মজুদ করা স্থানের কাছে আলো বা তাপের উত্স থাকা চলবে না। ডিলারদের কাছে সিলিন্ডার সরবরাহের ক্ষেত্রে উত্পাদকদের বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সনদের বিষয়টি যাচাই করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। চায়ের দোকানে চুলার পাশে মজুদ রেখে কিংবা সিগারেটের দোকানে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত চার বছরে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি পাঁচগুণ বেড়েছে। গত অর্থবছরে দেশে আমদানি করা ৩৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৮টি এবং দেশে তৈরি ১১ লাখ চার হাজার ৩৪৫টি এলপিজি সিলিন্ডার বাজারাজাত করা হয়েছে। ৫০ লাখের বেশি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বেচাকেনা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫২ লাখ ৮৯ হাজার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২১ লাখ ৮৫ হাজার এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ লাখ সিলিন্ডার। এর বিপরীতে সিলিন্ডার মজুদের জন্য সব মিলিয়ে মাত্র ৬ হাজার লাইসেন্স নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেক লাইসেন্স আবার নবায়ন করা হয়নি।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. সামসুল আলম বলেন, ছোট ছোট ডিলার যাদের ৪০টির সিলিন্ডার রাখার লাইসেন্স আছে তাদের কাছ থেকে অনেক দোকানি খুচরা কিনে বিক্রি করছে। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর ডিলারদের মাধ্যমে বাজারজাত করে। ডিলারদের লাইসেন্স দেখেই সিলিন্ডার-এলপিজি দিতে হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে লাইসেন্স ছাড়াই অনেকে ব্যবসা করছে। এ বিষয়ে আমরা শিগগিরই ব্যবস্থা নেব।
