সাভারের আশুলিয়ায় গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ কর্মাস ব্যাংকে ডাকাতি করার সময় গুলিতে ম্যানেজারসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। পালানোর সময় গণপিটুনিতে এক ডাকাত নিহত হয়। ডাকাতরা ‘গ্রেনেড’ ও গুলি ছোঁড়ে। এসময় আহত হন ১২ জন। নিহতরা হলেন ব্যাংক ম্যানেজার ওয়ালিউল্লাহ, নিরাপত্তা প্রহরী বদরুল আলম, গ্রাহক পলাশ, মুদি দোকানদার মনির হোসেন, দোকানদার জিল্লুর রহমান, পথচারী জমির উদ্দিন ও ইব্রাহিম। ডাকাতরা মোটর সাইকেলযোগে পালাবার সময় জনতা মোটর সাইকেলসহ দুই ডাকাতকে ধরে ফেলে। গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলে এক ডাকাত নিহত হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ব্যাংক থেকে লুট হওয়া ৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৫৫ টাকা। তবে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গ্রেনেড নয়, বোমা হামলা করা হয়েছে।
পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক এসএম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান জানান, পলাতক ডাকাতদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। আটককৃত ডাকাতের কাছ থেকে অন্য ডাকাতের তথ্য পাওয়া গেছে। জয়পুরহাট ও আশপাশের এলাকা ধরে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানান, নিহত ডাকাতের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে আটক হওয়া ডাকাতের বাড়ি জয়পুরহাটে। তাকে নিয়ে ডাকাত দলের অপর সদস্যদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডাকাতরা জঙ্গি কীনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংকের শাখাটি আশুলিয়া কাঠগড়া সড়ক থেকে ২০ গজ ভেতরে। দোতলা ভবনের দোতলায় ব্যাংকটির অবস্থান। ব্যাংকে ম্যানেজারসহ স্টাফ সাত জন। এর মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী একজন। লাঞ্চ আওয়ার। গ্রাহক দুই থেকে তিনজন। ফলে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কোন ধরনের তাড়া ছিল না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৩/৪টি প্রাইভেটকারযোগে আসা ১০-১২ জনের একদল ডাকাত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কাঠগড়া বাজারে অবস্থান নেয়। ডাকাত দলের মধ্যে তিন জন গ্রাহক সেজে প্রবেশ করে। পরে তারা ঐ ব্যাংকের প্রধান ফটকের সামনে থাকা নিরাপত্তাকর্মী বদরুল আলমকে জিম্মি করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এ সময় ব্যাংক ম্যানেজারসহ অন্য কর্মকর্তা ও ব্যাংকে থাকা গ্রাহকরা এগিয়ে আসলে তাদের সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার থেকে নগদ আনুমানিক ৬ লাখ টাকা লুট করে এবং ব্যাংকের ভল্ট ভাঙ্গার চেষ্টা করে। এসময় ব্যাংক ম্যানেজার পুনরায় বাধা দিলে ডাকাতরা তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করলে ঘটনাস্থলেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
ব্যাংকের ভিতরে ডাকাতির ঘটনাটি পার্শ্ববর্তী মসজিদ থেকে মাইকে প্রচার করলে বাজারের দোকানদার, ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী ডাকাতদের প্রতিরোধে এগিয়ে এসে। এসময় ডাকাতরা ব্যাংকের ভেতরে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে করতে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আসে। এতে ব্যাংকের গ্রাহক গ্লোরী ফ্যাশনের মালিক পলাশ ও নিরাপত্তা কর্মী বদরুল আলম নিহত হয়। ডাকাত দল ব্যাংক থেকে বেরিয়ে জনতার সামনে পড়লে ডাকাত দল ফিল্মি স্টাইলে জনতাকে লক্ষ্য করে উপর্যপুরী বোমা ও গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মোটরসাইকেল যোগে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এসময় ডাকাতদের গুলিতে মুুড়ি বিক্রেতা মনির হোসেন ও ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান মারা যান। গুলি ও বোমার বিস্ফোরণে এলাকাবাসী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এসময় মুহূর্তেই বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ী ও বাজারে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ডাকাত দলের সদস্যরা টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পার্শ্ববর্তী জিরাবো-বিশমাইল সড়ক থেকে ডাকাত দলের দুই সদস্যকে আটক করে এলাকাবাসী। এসময় স্থানীয়দের গণপিটুনিতে ডাকাতদলের এক সদস্য ঘটনাস্থলেই মারা যায়। জনতা ব্যাংক থেকে লুটে নেয়া টাকা ভর্তি একটি ব্যাগ উদ্ধার করে।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ডাকাতদলের অপর সদস্যকে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের সাথে এলাকাবাসীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় উত্তেজিত এলাকাবাসী পুলিশের দুটি গাড়িতে ভাঙচুর চালায় ও ডাকাতদের মোটরসাইকেলটি পুড়িয়ে দেয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডাকাতির প্রায় ৪০ মিনিট পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। এ নিয়ে পুলিশ ও এলাকাবাসীর মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ডাকাত দলের আহত ওই সদস্যকে উদ্ধার করে এনাম মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতালে ভর্তি করে।
ঘটনার সময় উপস্থিত গ্রাহক রাশেদ সিকদার জানান, তিনি দুইটার দিকে ব্যাংকে টাকা উত্তোলন করতে আসেন। ১০-১৫ মিনিট পরই অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত একদল লোক ব্যাংকের ভিতরে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। তার চিত্কারে ম্যানেজার ও কর্মকর্তারা এগিয়ে গেলে সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে তাদের সবাইকে জিম্মি করে। এরপরই তারা ব্যাংকের ভিতরে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়ে ও ‘গ্রেনেড’ বিস্ফোরণ ঘটায়।
ব্যাংকের ক্যাশ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীরা ব্যাংকে ঢুকেই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। তাদের বাধা দিতে গেলে ব্যাংক কর্মকর্তাসহ সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ক্যাশ কাউন্টার থেকে আনুমানিক ৬ লাখ টাকা লুট করে ও ভল্ট ভাঙ্গার চেষ্টা চালায়। এ সময় বাধা দিলে ডাকাতরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে।
এলাকাবাসী রবিন দেওয়ান বলেন, ডাকাতরা লুট করে পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা কয়েকজন একটি প্রাইভেটকার নিয়ে ডাকাতদের পিছু নেন। ঘটনাস্থল থেকে ৩শ’ গজ দূরে ডাকাত দলের দুই সদস্যকে টাকাসহ আটক করতে তিনি সক্ষম হন।
ব্যাংক ভবনের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান বরকত জানান, ‘আমাকে মোবাইল ফোনে একজন ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনা জানালে আমি সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাংকের পাশে মসজিদের ইমামকে মাইকে ঘটনা প্রচার করতে বলি। মসজিদের মাইকে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাটি প্রচার করলে বাজারে ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী এগিয়ে আসে।’
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজিম জানান, ডাকাতরা গ্রেনেড নয় বোমা হামলা করে। কয়েকটি পেট্রোল বোমাও উদ্ধার হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত চলছে। প্রকৃত ঘটনা অচিরেই উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেফতার সম্ভব হবে।