দেশের ১৯ জেলায় গত মঙ্গলবার রাতে কালবৈশাখী ঝড় তাণ্ডব চালিয়েছে। বিভিন্নস্থানে গাছ চাপা পড়ে ও বিভিন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছে ১১ জন। ঝড়ে বহু সংখ্যক ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে শিলাবৃষ্টি ও প্রচণ্ড বাতাসে বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য গাছপালা ঝড়ে ভেঙ্গে গেছে। খুঁটি উপড়ে পড়ায় ও বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে গেলে বিদ্যুত্হীন হয়ে পড়ে অনেক জেলা। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
হবিগঞ্জ: কালবৈশাখী ঝড়ে বানিয়াচং উপজেলা সদরের বাদাউড়ি গ্রামে আবুল ফজরের বাড়ির ওপর গাছ পড়লে তার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী নূরজাহান ও ৪ বছর বয়সী ছেলে সারওয়ান নিহত হয়। নবীগঞ্জের পূর্ব তিমিরপুর গ্রামে ঘরের ওপর গাছ পড়লে লাল মিয়া নামে একজন নিহত হয়। ঝড়ে জেলায় আহত হয়েছে ৩০ জন। বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় ২ হাজার বাড়িঘর। আংশিক ক্ষতি হয়েছে আরও ৩ হাজার বাড়িঘরের। ভেঙ্গে পড়েছে কয়েক হাজার গাছপালা।
স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর: কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়েছে জেলার প্রায় সবকটি উপজেলা। ঝড়ে চিরিরবন্দর উপজেলার জয়পুর গ্রামের মো. মতিউর রহমানের শিশুপুত্র আল ফাইদী (৩) এবং পার্বতীপুর উপজেলার সাহেবপাড়া গ্রামের মো. নাসিমউদ্দীনের স্ত্রী নূরজাহান বেগম (৩১) নিহত হয়েছে। আল ফাইদী ঘর চাপা পড়ে এবং নূরজাহান আতঙ্কে মারা যায়। বিভিন্ন স্থানে আহত ৩০ জনকে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত ঘরবাড়ি। উপড়ে গেছে হাজার হাজার গাছপালা। বোরো, ভুট্টা ক্ষেতসহ আম ও লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক স্থানে বৈদ্যুতিক খুটি উপড়ে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে বিদ্যুত্ সংযোগ।
গাইবান্ধা: কালবৈশাখী ঝড়ে সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের গঙ্গানারায়ণপুর গ্রামে গাছ চাপায় নবাব আলী মণ্ডল (৬০) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছে। এছাড়া গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, গোবন্দিগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলায় সহস াধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও অসংখ্য গাছপালা উপড়ে গেছে। মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গোটা জেলায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ঝড়ের সাথে প্রচুর বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির কারণে উঠতি বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
কিশোরগঞ্জ: সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের আমাটি শিবপুর গ্রামে কালবৈশাখী ঝড়ে হারুন-অর-রশীদের ঘরের ওপর গাছ ভেঙ্গে পড়লে তার শিশুপুত্র বাবুল (৫) ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। আহত হয় হারুণের স্ত্রী গুলেছা বেগম (৪৫) ও তার অপর পুত্র শফিক (৭)। কুলিয়ারচরে গত তিন দিন কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসল ও বিদ্যুতের লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
গোপালপুর (টাঙ্গাইল): কালবৈশাখী ঝড়ে ৫ হাজার একর জমির ধান গাছ মাটির সাথে মিশে গেছে। সহস াধিক একর জমির পাট ও সবজি নষ্ট হয়েছে। তিন শতাধিক বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আহত হয়েছে ১০ জন। বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গোপালপুর, মধুপুর, ধনবাড়ি ও ঘটাইল উপজেলার তিনটি পৌরশহরসহ ২৫ ইউনিয়নের দেড় হাজার গ্রামে বিদ্যুত্ নেই।
শেরপুর : নালিতাবাড়ি উপজেলার কলসপাড় ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামে কাসেম মিয়ার বাড়িতে গাছ ভেঙ্গে পড়লে ঘরের ভিতর ঘুমিয়ে থাকা হায়দর আলী নামে এক বৃদ্ধ মারা যান। বিভিন্ন উপজেলায় ঘর-বাড়ি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝিনাইগাতী উপজেলার দুধনই, হলদিগ্রামসহ পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ও হাট-বাজারের দোকানপাট ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শেরপুর সদর উপজেলার চরাঞ্চালে ফসলসহ বিভিন্ন সবজি, গাছপালা এবং শেরপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ক্লাস রুমের টিনসেড চাল উড়ে গেছে। নকলা, নালিতাবাড়ি ও শ্রীবর্দী উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কাচা ঘরবাড়ি, গাছপালা, সবজি ও বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি ও তার ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে গতকাল দুপুর পর্যন্ত জেলা বিদ্যুিবহীন ছিল।
মৌলভীবাজার: সদর উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ৪টি ইউনিয়নে ও মৌলভীবাজার পৌরসভার প্রায় দুই শতাধিক ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন ও গাছপালা লণ্ডভণ্ড হয়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানের। ঘর ও গাছের নিচে চাপা পড়ে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। লাউয়াছড়া উদ্যান এলাকায় রেল লাইনের উপর গাছ ভেঙে পড়লে সিলেটের সাথে সারাদেশের রেল যোগাযোগ ৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকে।
বকশীগঞ্জ (জামালপুর): বকশীগঞ্জে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে প্রায় দুই শতাধিক ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। গাছ চাপা পড়ে পৌরশহরের পাখিমারা এলাকার মোকছেদ আলীর মেয়ে নিঝুম মনির (২০) মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৩০ জন। শিলাবৃষ্টিতে ইরি-বোরো পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: ঝড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দুই শতাধিক কাঁচা ঘর-বাড়ি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের তাণ্ডবে ঝরে পড়েছে প্রচুর আম। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙ্গে পড়ায় দুপুর পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নিউ মার্কেট ও নিমতলা এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
নেত্রকোনা: কালবৈশাখী ঝড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ২০ কোটি টাকা।
রংপুর: পীরগঞ্জে দেয়াল চাপা পড়ে বড় আলমপুর ইউনিয়নের বাঁশ ফুকুরিয়ার মণ্ডলপাড়ার আব্দুল লতিফ ও চতরা ইউনিয়নের চকভেকার গ্রামের গেল্লা সরকারের স্ত্রী আছিয়া বেগম নিহত হয়েছে। এছাড়া শিশুসহ আহত হয়েছে প্রায় শতাধিক মানুষ। আহতদের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঝড়ের তাণ্ডবে রংপুরের প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ে উপড়ে গেছে প্রায় ৫০ হাজার গাছপালা। ১০ হাজার হেক্টর জমির ভুট্টা, ধানসহ রবি ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে যাওয়াসহ তার ছিঁড়ে যাওয়ায় বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ ও পীরগঞ্জ উপজেলা।
বগুড়া: কালবৈশাখী ঝড়ে বগুড়া সদর ও সোনাতলা উপজেলায় দুই জন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- সোনাতলার পাকুল্যা ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বাদল কাজী (৫৫) এবং সদরের আশোকোলা উত্তরপাড়া গ্রামের বেলাল হোসেন (৫০)। বাদল কাজী স্থানীয় বিলে নৌকায় চড়ে পাহারাদারের কাজ করছিলেন। ঝড়ে নৌকা উল্টে গেলে বাদল কাজী পানিতে ডুবে যায়। দেয়াল ধসে নৈশপ্রহরী বেলাল হোসেন মারা যান। বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি-ঘরের টিনের চালা উড়ে গেছে। অনেক বাড়ির মাটির দেয়াল ধসে গেছে। অসংখ্য গাছপালা উপড়ে গেছে। ঝড়ের পর প্রায় ৯ ঘণ্টা বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন ছিল পুরো শহর।
ফুলবাড়িয়া, ভালুকা ও মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ): ফুলবাড়িয়ায় দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সহস্রাধিক ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। কালাদ ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারসহ ২০ জন আহত হয়েছে। মুক্তাগাছা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের হূদয় মোড় সংলগ্ন এলাকায় গাছ ভেঙ্গে পড়লে মঙ্গলবার রাতে উত্তরবঙ্গ, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও ময়মনসিংহ সড়কে চলাচলরত শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। গতকাল সকালে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। ভালুকায় ৫০০ একর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উলিপুর (কুড়িগ্রাম): উলিপুরে কালবৈশাখী ঝড়ে উঠতি বোরো ধান, ঘর-বাড়ি, সবজি ক্ষেত ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
উখিয়া (কক্সবাজার): উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বোরো পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রোহিঙ্গা বস্তির সাড়ে ৪ শতাধিক ঝুপড়ি, মাদ্রাসা, স্থানীয় ৫০টি কাঁচা ঘরবাড়িসহ প্রায় ৫ শতাধিক বসত বাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শিলা বৃষ্টিতে আম, লিচু ও তরমুজের ক্ষতি হয়েছে।
জয়পুরহাট: ঝড়ে জেলায় অনেক গাছপালা ভেঙ্গে গেছে। সবজিসহ ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। ফিডার বিকল হওয়ায় মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বেলা ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুত্ ছিল না জেলায়।
মহাদেবপুর (নওগাঁ): মহাদেবপুরে শিলাবৃষ্টিতে বোরোচাষিদের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে।
