রাজধানীসহ সারাদেশে গতকাল তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এসময় মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ভূমিকম্প অনুভূব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষজন যে যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় নেমে আসে রাস্তা ও খোলা জায়গায়। ঘরবাড়ি, বহুতল ভবন, দোকানপাট ও অফিস থেকে দৌড়ে ও হুড়োহুড়ি করে নেমে আসা মানুষজনের মধ্যে এই আতঙ্ক ছিল বহুক্ষণ।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস কর্মকর্তা আবুল কালাম মল্লিক জানান, বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ১১ মিনিটে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ঢাকা থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার দূরে নেপালে। রিখটার স্কেলে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। প্রথম কম্পনটির পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে জানানো হয়, রিখটার স্কেল অনুযায়ী ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থলে এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৯। তীব্রতা অনুযায়ী এটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ৮১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ছিল ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল। ঢাকায় প্রথম দফায় ভূমিকম্পটি প্রায় দুই মিনিট স্থায়ী ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
বগুড়া, লক্ষ্মীপুর, টাঙ্গাইল ও পাবনায় আতঙ্কে মারা গেছে চার জন। ভূমিকম্প আতঙ্ক ও ভবন থেকে নামতে গিয়ে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ও গার্মেন্টস শ্রমিক অসুস্থ ও আহত হয়েছে। অনেক শ্রমিক, শিশু ও মেয়ে শিক্ষার্থী ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আহত ও অসুস্থ শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা দেয়া হয়। ভূমিকম্পের সময় তাড়াহুড়ো করে বহুতল ভবন থেকে নামতে গিয়ে রাজধানী, কুমিল্লা, ঈশ্বরদী ও নারায়ণগঞ্জে বহু গার্মেন্টস শ্রমিক আহত হয়েছে। ভূমিকম্পে রাজধানীতে অন্তত ৮টি ভবন ও বাড়ি সামান্য হেলে গেছে। এছাড়া দেশের কয়েকটি জেলায়ও ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বংশালের ২৪৯/১ নম্বর ছয়তলা বাড়িটি ভূমিকম্পের পর রাজউকের কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে সিলগালা করে দেয়। রাজউক কর্মকর্তারা জানান, ভূমিকম্পে বাড়িটি অন্তত এক ইঞ্চি একদিকে হেলে গেছে।
বংশাল থানার ওসি আব্দুল কুদ্দুস জানান, অর্ধ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ওই ছয়তলার বাড়িটিতে স্কুল ব্যাগ তৈরি করা হয়। ভূমিকম্পের সময় ওই কারখানার শ্রমিকরা আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
গুলিস্তানের বঙ্গবাজার মার্কেটের কাছে আলাউদ্দিন ভবন নামে ৫ তলা একটি বাড়ি হেলে পড়লে সেটি সিলগালা করে দেয়া হয়। নবাবপুর পুলিশ ফাঁড়ির কাছে একটি ছয়তলা বাড়ি সামান্য হেলে পড়েছে। গুলশানে হোটেল সেরিনা সামান্য হেলে পড়েছে। লালবাগের ইসলামবাগের এরশাদ কলোনীর পিছনে ছয়তলা একটি বাড়ি হেলে পড়লে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা গিয়ে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়। শ্যামলীতে ১৮ তলা বিশিষ্ট আশা টাওয়ার হেলে পড়েছে এমন খবরে সেখানকার আশা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও সাউথ-ইস্ট ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী টিম সেখানে গিয়ে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি পায়নি। একই অবস্থা বিরাজ করে বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে ২৪ তলা বিশিষ্ট ইফাদ টাওয়ারে। ভূমিকম্পের পর ঐ ভবনের বিভিন্ন অফিস থেকে মানুষ রাস্তায় বের হয়ে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম সেখানে গিয়ে ভবনের তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পায়নি। মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত ডায়মন্ড ফ্যাশন গার্মেন্টস থেকে ভূমিকম্পের সময় কর্মরত শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে পড়েন। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে ১০ শ্রমিক সামান্য আহত হন। বাড্ডার কুড়িলের জান্নাত মঞ্জিল নামে একটি বাড়ি থেকে ফায়ার সার্ভিসকে জানানো হয় যে, তাদের বাড়ি হেলে পড়েছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম ঐ বাড়ি পরিদর্শন করে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি পায়নি।
ভূমিকম্পের ওপর আমাদের অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
বগুড়া: ভূমিকম্পের সময় দুপচাঁচিয়া উপজেলার অনাহত সিংড়া গ্রামের বয়েজ উদ্দিনের স্ত্রী মোর্শেদা বেগম (৫৫) গোয়াল ঘরের মাটির দেয়াল চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে তার মৃত্যু হয়। বগুড়ার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) গাজিউর রহমান দেয়াল চাপায় গৃহবধূর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ।
এছাড়াও জেলার শাজাহানপুর উপজেলার খোট্টাপাড়া ইউনিয়নের ভোমর কুঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের একাংশ দেবে গিয়ে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে এলাকাবাসী সূত্র দাবি করেছে।
সোনাতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাবিবুর রহমান জানান, উপজেলার পাঠানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি একাডেমিক ভবন মাটিতে দেবে গেছে এবং ভবনে ফাটল ধরেছে। এছাড়াও ভূমিকম্পের প্রভাবে উপজেলায় অবস্থিত ডাকবাংলোর ১২০ মিটার প্রাচীর ধসে গেছে।
পাবনা: ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় পড়ে আঘাত পেয়ে পাবনা পৌর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী রোকেয়া খানম ইতির (৬৫) মৃত্যু হয়েছে। তিনি পাবনা পৌর সদরের গোপালপুর মহল্লার সোহরাব হোসেনের স্ত্রী ও পাবনা আদর্শ গার্লস হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা।
জানা গেছে, গতকাল ভূ-কম্পনের বাড়ির পাশে সড়কে হাঁটছিলেন রোকেয়া। এসময় তিনি আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে আঘাত পান। পরে স্থানীয়রা তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এছাড়া ভূ-কম্পনে আতঙ্কিত হয়ে পাবনা আদর্শ গার্লস হাই স্কুল, আটঘরিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও চাটমোহর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হয়। ঈশ্বরদী মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ও ঈশ্বরদী ইপিজেডের শ্রমিকসহ অন্তত দেড়শ আহত হয়েছে। ইপিজেডের জাপানি প্রতিষ্ঠান নাকানো ইন্টারন্যাশনাল ও চীনা প্রতিষ্ঠান এমজিএল লিমিটেডের দুইটি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। আহত শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঈশ্বরদী শহরের ব্যবসায়ীরা ভয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। এসময় ৮ জন মাথা ঘুরে পড়ে যায়।
রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর): উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাটরা গ্রামের মোল্লা বাড়ির মো. কালু মিয়া (৬৫) ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে মারা গেছেন বলে জানান স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, কালু মিয়া বাড়ির পাশে জমিতে ধান কাটছিলেন। ভূমিকম্প শুরুর সাথে সাথে তিনি আতঙ্কিত হয়ে নিজ বাড়িতে দৌড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি মারা যান।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল): গোড়াই শিল্পাঞ্চলের সৈয়দপুর এলাকার সুকুমুদ্দিনের স্ত্রী পরিনা আক্তার গতকাল আতঙ্কে মারা গেছেন। জানা গেছে, তিনি তার দেড় বছরের শিশুপুত্র রাব্বিকে নিয়ে তাদের ভাড়াকৃত আধাপাকা বাড়িতে ছিলেন। ভূমিকম্প শুরু হলে আধাপাকা ঘরটি হেলতে থাকে। ঘটনা দেখে তিনি ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। স্থানীয় লোকজন তাকে কুমুদিনী হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করলে পথেই তিনি মারা যান।
এদিকে, গোড়াই শিল্পাঞ্চলের ৩/৪টি কারখানায় ফাটল দেখা দিলে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এছাড়া উপজেলার কাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় ফাটল দেখা দিয়েছে বলে শিক্ষকরা জানিয়েছে।
পঞ্চগড়: পঞ্চগড় বাজারের কাপড়পট্টিতে নির্মাণাধীন একটি ভবনের দোতলার দেয়াল ধসে পড়ে এক শ্রমিক আহত হয়েছেন। ভূমিকম্পে শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা গেছে।
হোমনা (কুমিল্লা): উপজেলার খাদিজা মোমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কাশিপুর হাসেমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১১ ছাত্রী তাড়াহুড়া করে নিচে নামতে গিয়ে আহত হয়েছে। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
রংপুর: দৌড়ে ও হুড়াহুড়ি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হতে গিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ৩০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়। ৩ তলা ভবন থেকে নামতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে পড়ে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ৩ শিক্ষার্থীকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কুমিল্লা: ভূমিকম্পের সময় কুমিল্লা ইপিজেডে আতংকে ভবন থেকে হুড়োহুড়ি করে নীচে নামতে গিয়ে ৩টি কারখানার কমপক্ষে শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। কাদেনা স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড, বিএমটি ইন্টারন্যাশাল ও জিং চাং সুজ (বিডি) লি. কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। তাদের কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ইপিজেড মেডিক্যাল সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে।
খুলনা অফিস: ভূমিকম্পে নগরীর বড় বাজারের হেলাতলা মোড়ের একটি চারতলা ভবনসহ দুটি ভবন ও নগরীর প্রাণকেন্দ্র পিকচার প্যালেস মোড়ের আজমল প্লাজা হেলে পড়েছে। এছাড়া নগরীর দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির পাশে ইব্রাহীম নামের একজনের পাঁচতলা একটি ভবনের নিচতলা দেবে গেছে। অপরদিকে মহানগর বিএনপি কার্যালয়ের পাশের একটি ভবনে ফাটল দেখা গেছে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।
ফেনী: শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কের একটি ১০তলা ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভূমিকম্পে শাহ আলম টাওয়ারের তিন তলা থেকে ১০তলা পর্যন্ত ফাটল দেখা দেয়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ওই টাওয়ারে অবস্থিত ব্যাংক-বীমাসহ সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। পরে প্রশাসন ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নত করে সিলগালা করে দেয়।
আত্রাই (নওগাঁ): উপজেলার নৈদীঘি উচ্চ বিদ্যালয়, সিংসাড়া কছির উদ্দিন দেওয়ান মেমোরিয়াল হাই স্কুল এন্ড কলেজ ও আত্রাই পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
চরভদ্রাসন (ফরিদপুর): গতকাল দুপুরে ভূমিকম্পে চরভদ্রাসন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে যায়। তাদের তাত্ক্ষণিক চরভদ্রাসন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে চিকিত্সা দেয়া হয়।
ময়মনসিংহ:ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কালিকাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভূমিকম্পের সময় ভবন থেকে তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ৯ জন আহত হয়েছে। তাদের ধোবাউড়া থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ): উপজেলার গয়হাট্টা সালেহা ইসহাক উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ ও আহত হয়। অসুস্থ ও আহত শিক্ষার্থীদের উল্লাপাড়া বেঙ্গল কমিউনিটি হাসপাতালসহ স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।
নীলফামারী:ভূকম্পনে শহরের বেশিরভাগ বহুতল ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও মোবাইল টাওয়ার দুলে ওঠে। ফলে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়। দোকান বাসাবাড়ি থেকে মানুষজন রাস্তায় বেরিয়ে আসে। এসময় ভবন থেকে তারাহুরো করে নামতে গিয়ে অনেকেই আহত হন।
গাইবান্ধা: গাইবান্ধা শহরের নিউ ব্রিজ রোডে এন এইচ মর্ডান উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪টি শ্রেণি কক্ষের দেয়াল ও ছাদে ফাটল এবং পলেস্তরা খসে পড়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত সড়ে পড়ায় কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ভূকম্পনের সময় সাদুল্লাপুর বালিকা দাখিল মাদ্রাসার ছাত্রীরা ভয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে।
নারায়ণগঞ্জ: ভূমিকম্পে বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। ভূমিকম্পে শহরের নয়ামাটি এলাকায় একটি ৬ তলা ভবন কিছুটা হেলে পড়লে সেটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। ওই ভবনে থাকা লোকজনদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ৩ শ’ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুপুরের ভূমিকম্পের পর ফতুল্লার কায়েমপুরে ফকির নিটওয়্যার এর ১২ জন শ্রমিককে আনা হয়েছে। এছাড়া আরো কয়েকটি গার্মেন্ট কারখানারও আরো ৮ জনের মত শ্রমিক আহত হয়েছে।
চৌগাছা (যশোর): চৌগাছায় একটি গার্মেন্টসের ছয়তলা থেকে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে চার মহিলা শ্রমিক আহত হয়ে চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে।
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ): ডহরগাঁও এলাকার ফকির ফ্যাশনের ভবনে ফাটল ও আউখাবো এলাকার অনুপম হোসিয়ারী ইন্ডাষ্ট্রিজ নামক পোশাক কারখানা হেলে পড়েছে। অনুপমের নয়তলা ভবন থেকে শ্রমিকরা নিচে নামার সময় অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছে। আহতদের প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।
ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল): তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে ভূঞাপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ১১ জনকে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ): শাহজাদপুরে ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া শাহজাদপুর পৌর এলাকার মনিরামপুর, দ্বাড়িয়াপুর, রামবাড়ী, থানার ঘাট পাড়ায় বহুতল ভবনের বাসিন্দারা ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করে ঘর-বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে।
বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): রুপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ভূমিকম্পের আতঙ্কে হুড়াহুড়ি দৌড়াদৌড়ি করে ক্লাস রুম থেকে বের হওয়ার সময় পড়ে গিয়ে ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী আহত হয় অভিভাবকদের অনুরোধে স্কুলগুলো ছুটি দিয়ে দেয়া হয় ।
ধামরাই (ঢাকা): ধামরাইয়ের শ্রীরামপুর গ্রাফিক্স টেক্সটাইল কারখানার ভবনে ফাটলের খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে আতংকের সৃষ্টি হয়। প্রায় চার হাজার শ্রমিকের অধিকাংশই কারখানা ছেড়ে চলে যায়।
মুন্সীগঞ্জ: মুক্তারপুর-পঞ্চপট্রি সড়কের চর সৈয়দপুর এলাকার বর্ণালী ফেবি্রক্স লিমিটেডের পাঁচতলা ভবন নিয়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ভবনটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং সামান্য দেবে গেছে বলে শ্রমিক আশঙ্কা করছে।
নওগাঁ : রাণীনগর উপজেলার মধুপুর উচ্চ বিদ্যালয়, আত্রাই উপজেলার নৈদিঘী হজরত আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও বান্দাইখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নওগাঁ কেডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, শহরের গোস্তহাটির মোড় এলাকার দুবলহাটি রোডে চিস্তিয়া মানি একচেঞ্জের স্বত্বাধিকারী আজাদের নির্মাণাধীন বহুতল ভবন, আকতার ও আফজালের বাস ভবন, মেসার্স হাজী ষ্টোরের স্বত্বাধিকারী এরশাদুল হকের বহুতল ভবন, নওগাঁ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী শামসুল হকের বাসা ফাটল দেখা দিয়েছে। মধুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী সামান্য আহত হয়।
নরসিংদী: নরসিংদীতে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। শহরের ব্রাহ্মন্দী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৮ জন ছাত্রী, নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩ জন ছাত্রী, ঘোড়াদিয়া, রাজাদী, চিনিশপুর, চরনগরদী, গয়েশপুর, সাটিরপাড়াসহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। অবশ্য পরে তারা সুস্থ হয়ে ওঠে।
সোনাতলা (বগুড়া): সোনাতলায় ভূমিকম্পে ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে ফাটল ধরেছে। বিদ্যালয় ৮টি হলো—পাঠানপাড়া, কানুপুর, কর্পূর, হুয়াকুয়া, আচারেরপাড়া, শ্যামপুর, মোনারপটল ও মহিচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া দিগদাইড় ইউনিয়ন পরিষদ ভবনেও ফাটল ধরেছে। এদিকে ডাকবাংলার দক্ষিণ পাশের সীমানা প্রাচীর ভেঙে পড়েছে।
নাটোর: দুই দফা ভূমিকম্পে শহরের চকরামপুর এলাকার ৫তলা বেসরকারি একতা হাসপাতাল (ক্লিনিক) পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ওপরে হেলে পড়ায় জেলা প্রশাসনের নির্দেশে পুলিশ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অর্ধশত রোগীকে শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ভূমিকম্পে নাটোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ভবনের দুটি কক্ষে ফাটল দেখা দিয়েছে।
যশোর অফিস: ভূমিকম্পে শহরের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম একাডেমি স্কুলের মূলভবনের দেওয়ালে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া): হোসেনাবাদ এলাকায় আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরিতে ফাটলের সৃষ্টি হয়। ফলে ফ্যাক্টরিটি ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ সময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মিরপুর (কুষ্টিয়া): ভূমিকম্পের আতঙ্কে মিরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন থেকে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে ১৫ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে।
এছাড়া পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জামালপুর, নাটোর, জয়পুরহাট, কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, বরিশাল, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, ঠাকুরগাঁও, ফরিদপুর, মৌলভীবাজার, মাগুরা, বাগেরহাট, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, চাঁদপুর, মাদারীপুর, পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, নেত্রকোনা, গাজীপুর, দিনাজপুর, সিলেট, বরগুনা, হবিগঞ্জ, শেরপুর ও মেহেরপুর থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা ভূমিকম্পে লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি ও কম-বেশি ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
