আর মাত্র একদিন পর অনুষ্ঠিত হবে তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। আজ রবিবার মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা। নির্বাচন নির্দলীয় হলেও দেশের দুই প্রধান জোট দলীয়ভাবে নেমেছে প্রচারযুদ্ধে। এই প্রচারযুদ্ধের কারণে একদিকে নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে উত্সাহ-উদ্দীপনা অন্যদিকে ভোটারদের মধ্যে বিরাজ করছে উত্কণ্ঠা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এ নির্বাচনকে বিবেচনা করছেন, দুই জোটের মর্যাদা এবং অস্তিত্বের লড়াই হিসাবে। ১৪ দলীয় জোটের কাছে এটি মর্যাদার লড়াই এবং ২০ দলীয় জোটের কাছে এ নির্বাচন অস্তিত্বের সংগ্রাম।
সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তিন সিটিতে প্রায় ৮২ হাজার নিরাপত্তা সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। সেনাবাহিনী ছাড়া দেশের সকল বাহিনীর সদস্যই নিয়োজিত থাকবেন নিরাপত্তার দায়িত্বে। ক্যান্টনমেন্টে সেনাবাহিনীকে রাখা হয়েছে রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে। বলা হয়েছে, রিটার্নিং অফিসার ডাকলে সেনা সদস্যরা মাঠে নামবেন।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। র্যাব, পুলিশ, আনসার, বিজিবিসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে প্রতি সিটিতে এক ব্যাটালিয়ন করে সেনা সদস্য ক্যান্টনমেন্টে প্রস্তুত থাকবে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সবধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। কেউ ভোটকেন্দ্র দখল বা ব্যালট ছিনতাই করতে আসলে গুলি করার হুকুম দেয়া হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে।
ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট ৪৮ জন মেয়র প্রার্থী, ২৪৮ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও ৮৮৪ জন সাধারণ কাউন্সিলরসহ ১ হাজার ১৮০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১৬ মেয়র, ৮৯ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর, ২৮১ জন সাধারণ কাউন্সিলর, ঢাকা দক্ষিণে ২০ জন মেয়র, ৯৭ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর, ৩৯০ জন সাধারণ কাউন্সিলর, চট্টগ্রামে ১২ মেয়র, ৬২ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর, ২১৩ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন।
এবার সবচেয়ে বেশি প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ জন্য কারণে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত প্রতীক বরাদ্দ করতে হয়েছে। নির্বাচনে একজন ভোটারকে তিনটি ব্যালটে সিল মারতে হবে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাস। এছাড়াও সাড়ে ৩ হাজারের মতো দেশি পর্যবেক্ষক থাকছেন পর্যবেক্ষণে।
গত ৭ এপ্রিল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করেন। ঘুম হারাম করে প্রার্থীরা ভোটারদের দোরগোড়ায় ছুটছেন। চৈত্রের খরতাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশাখের ধমকা-হাওয়াসহ বৃষ্টি। কিন্তু প্রচারণা থেমে নেই প্রার্থীদের। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারলেও বিএনপির একজন মেয়র প্রার্থীসহ প্রায় ৫৬ জন কমিশনার প্রার্থী এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের পক্ষে স্ত্রী-পুত্র ও পরিবারের সদস্যরা প্রচারণা চালিয়েছেন। বিরোধী জোটের প্রধান নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ৫ দিন ঢাকার দুই সিটিতে গণসংযোগ চালিয়েছেন। আচরণবিধির বাধার কারণে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীর পদমর্যাদার নেতারা প্রচারণায় অংশ নিতে পারেননি।
দেদারসে আচরণ বিধি লংঘন
তিন সিটিতে ১৮ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজগে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তাদের কোন তত্পরতা দেখা যায়নি। দু’-একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে মাঠে দেখা গেলেও দুর্বল প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে। নির্বাচনে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করা হলেও এবার সেটিও করা হয়নি।
আচরণ বিধি লংঘনের ঘটনা ঘটছে দেদারসে। খোদ বিএনপির চেয়ারপার্সন, জাতীয় পার্টি-জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লংঘনের অভিযোগ উঠেছে। এই দু’জনকেই কমিশন থেকে দেয়া হয়েছে নোটিস। যদিও বিএনপি নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ দাবি করেছেন, খালেদা জিয়া কোন গাড়িবহর নিয়ে প্রচারণা চালাননি। তার সঙ্গের বহরের প্রায় সব গাড়ি নিরাপত্তা কর্মী ও গণমাধ্যমের। এছাড়া আচরণ বিধির কোথাও বলা নেই দু’চারটি গাড়ি নিয়ে প্রচারণা চালানো যাবে না। আচরণ বিধিতে শুধু যানবাহন নিয়ে মিছিল এবং ভোটকেন্দ্রে যানবাহন ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
প্রার্থী এবং তার সমর্থকদের বিরুদ্ধেও আচরণ বিধি লংঘনের অভিযোগ রয়েছে। মিছিল-সমাবেশ চলছে হরদম। জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা-বন্ধ করেই চলছে প্রচার। ব্যয়সীমা লংঘন করে দেদারসে অর্থ খরচ করছেন প্রার্থীরা। সময় না মেনে একই ওয়ার্ডে এক প্রার্থীর একাধিক মাইক চলছে। নির্দলীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক নেতাদের ছবিও ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু কমিশনের কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। কেবল নোটিস এবং কতক দুর্বল প্রার্থীদের জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করেছে কমিশন।
আজ মধ্যরাতে শেষ প্রচারণা
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালার বিধি ৭৪ এর উপ-বিধি (১) অনুযায়ী, ‘কোন নির্বাচনী এলাকার ভোট গ্রহণ শুরুর পূর্ববর্তী ৩২ ঘন্টা’ অর্থাত্ আজ রাত ১২টার পর থেকে শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। এছাড়া ভোটের দিন এবং ভোট পরবর্তী ৪৮ ঘন্টা সময়ের মধ্যে নির্বাচনী এলাকায় কোন ব্যক্তি কোন জনসভা আহবান, অনুষ্ঠান বা তাতে যোগদান করা এবং কোন মিছিল বা শোভাযাত্রা সংগঠিত বা তাতে যোগদান করতে পারবেন না।
নিরাপত্তার চাদরে থাকবে তিন সিটি
দুই নগরীকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। আজ থেকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হচ্ছে নিরাপত্তা চৌকি। ভোটারদের নিরাপত্তা আর ভোটদান নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে ৩ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার মিলে প্রায় ৮২ হাজার সদস্য এই নির্বাচনে মাঠে কাজ করছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে নিয়োজিত থাকবেন ১৭ হাজার নিরাপত্তা কর্মী। ২৬ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত নির্বাচনী অপরাধ দমন ও সংক্ষিপ্ত বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৪৭৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৩০ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন। নির্বাচনের রুটিন ওয়ার্কের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার আর সন্ত্রাসী, মাস্তানদের আটকে পরিচালনা করছে বিশেষ অভিযান। মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পুলিশ, এপিবিএন, ব্যাটালিয়ন আনসার, র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন থাকবে। সেই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে পুলিশ, আনসার-ভিডিপি সদস্য নিয়োজিত থাকবে।
তিন সিটিতে প্রায় অর্ধ লাখ ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। তিন সিটিতে মোট ভোটকেন্দ্র ২ হাজার ৭০১টি, ভোটকক্ষ ১৫ হাজার ৫৪৪টি, মোট ভোটার ৬০ লাখ ২৯ হাজার ৫৭৬ জন।
