ভূমিকম্প

সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রংপুর তালিকায় শতাধিক ভবন

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৫, ০০:১২

ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রংপুরে নতুন-পুরাতন শতাধিক ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন লোকজন, চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস। এরই মধ্যে গতকাল শনিবার রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় দু’দফা বড় ধরনের ভূমিকম্পের ফলে ওইসব ভবনে বসবাসকারী মানুষেরা আতংকিত হয়ে পড়েছেন। তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে চরম উত্কণ্ঠায়।

 
গণপূর্ত বিভাগ ও আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, সারাদেশের মধ্যে রংপুর ভূমিকম্প ঝুঁকির দিক দিয়ে রয়েছে ১ নম্বরে। রংপুর মহানগরীতে পরিত্যক্ত ভবন ধসে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা মাহিগঞ্জ এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি। গত ৩ বছরে রংপুর অঞ্চলে প্রায় ৭০টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এতে নগরীর বেশ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বড় ধরনের ফাটল ধরে। এদিকে নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড় সংলগ্ন ঢাকা হোটেলের সামনের আনোয়ার আহম্মেদ ও মরহুম রিয়াজ আহম্মেদের মালিকানাধীন পুরনো জরাজীর্ণ ভবনটি অপসারণের জন্য রংপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পত্র প্রেরণ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
 
স্থানীয় গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রংপুর মহানগরীর শতাধিক ভবন এখন ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। অনেক পুরনো ভবনের কোনো কোনোটির বয়স শত বছর ছাড়িয়ে গেছে। নগরীর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে রংপুর সরকারি কলেজের সেন্ট্রাল রোডস্থ শহীদ মোসলেম উদ্দিন ছাত্রাবাস। ইট-সুরকি দিয়ে তৈরি ভবনের পিলার ও ছাদে বড় বড় ফাটল ধরেছে। এখানে অবস্থানরত ছাত্রদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে চরম আতংক আর উত্কণ্ঠার মধ্যে। কখন ঘটে দুর্ঘটনা। কে হারাবে জীবন। বৈশাখ মাস আসার পর থেকেই ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছে আর সেই বৃষ্টির পানি ঠেকাতে রুমের ছাত্ররা ভাতের প্লেট, বড় বড় গামলাসহ পলিথিন ব্যবহার করছেন। সজীব হোসেন নামে এক ছাত্র জানান, ছাত্রাবাসটি দেড়শ বছরের পুরনো। সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হওয়ায় এবং আইনি জটিলতার কারণেই নাকি কলেজ কর্তৃপক্ষ এটি ভেঙে ফেলতে পারছেন না। এ ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা জেলা প্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয়কেও অনেকবার অবগত করা হয়েছে। তবুও কোনো সমাধান আসেনি ওপর মহল থেকে।
 
মোসলেম উদ্দিন ছাত্রাবাসের মতো রংপুর নগরীতে শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিত্যক্ত ভবন রয়েছে। জেলা প্রশাসন, গণপূর্ত বিভাগ ও রংপুর সিটি করপোরেশন সেগুলোকে অনেক আগেই বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবনগুলোতে লোকজনকে থাকতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, শুধু আইনি জটিলতার কারণেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে ফেলতে বিলম্ব হচ্ছে।
 
এছাড়াও রংপুর সিটি করপোরেশনের পুরনো ভবন, সমবায় ব্যাংক ভবন, গোল্ডেন টাওয়ার হোটেলের বিপরীতে আরও একটি ভবন, সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার পিছনের ভবনসহ ব্যাংকের মূল ভবন, মাহিগঞ্জে পুরনো মসজিদ-মন্দির, বেশকিছু বাসাবাড়িসহ আফানউল্লাহ হাই স্কুল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, সেন্ট্রাল রোডস্থ   ছবিঘর ভবন, টাউন হল সংলগ্ন লক্ষ্মী সিনেমা হল ও এর পার্শ্ববর্তী স্টাফ কোয়ার্টার, দর্শনা মোড়ে কেসি ছাত্রাবাস, কারমাইকেল কলেজের পুরনো বিএনসিসি ভবন, শিক্ষকদের হোয়াইট হাউস ভবন ও ছাত্রদের জিএল এবং কেবি ছাত্রাবাস, লালবাগ হাট সংলগ্ন বেশ কয়েকটি ছাত্রাবাস, সেন্ট্রাল রোডে নবাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ি, সেনপাড়ায় টিপাইদির বাড়ি, বাকালী হাউস, মেডিক্যাল এলাকায় স্টাফ কোয়ার্টার ছাড়াও নগরীর গুপ্তপাড়া, দেওয়ানবাড়ী রোড, পুরনো রংপুর, স্টেশন বাবুপাড়া, মুন্সিপাড়া, গোমস্তপাড়া, শিমুলবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক ভবনই রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে।
 
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালসহ প্রায় ৫০টি বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবন মারাত্মক ‘অগ্নি ঝুঁকিতে’ রয়েছে। অনেক ভবন নির্মাণেই বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে না। ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, প্রাইম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ডেন্টাল কলেজ, আরডিআরএসের ১টি ভবন, এসএ পরিবহন ভবন, মোতাহার কমপ্লেক্স, গোল্ডেন টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্স, রজনী গন্ধা মার্কেট, হোটেল নর্থ ভিউ, শাহবাড়ী টাওয়ার, শাহ আমানত, ভরসা টাওয়ার, রেজেকা টাওয়ার, কছির উদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালসহ আর. কে রোড, ধাপ, লালকুঠি, মেডিক্যাল পূর্বগেট এলাকার প্রায় ১০টি নির্মাণাধীন ও নির্মিত ভবন রয়েছে এই ‘অগ্নি ঝুঁকির’ মধ্যে। অগ্নিনির্বাপক আইন ২০০৩ সালের ৭ ও ৮ ধারা অনুযায়ী বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনে কমপক্ষে ২টি সিঁড়ি, সামনে ৩০ ফুট রাস্তা, পিছনে ও পাশে ৫ ফুট করে জায়গা রাখার বিধান থাকলেও কেউ আইন অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করেননি। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, প্রাইম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং ডেন্টাল কলেজের প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থীসহ রোগীরা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাইম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের সময় এটি ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের নকশার অনুমোদন নেয়া হলেও পরবর্তী সময় সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে পুনরায় নকশার অনুমোদন নেয়া হয়নি। বিল্ডিং কোডও মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রাইম কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছেন। ভবন ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
 
এসব ব্যাপারে রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর সাথে গতকাল যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নগরীতে যেসব ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড এবং অগ্নিনির্বাপক আইন অনুসরণ করা হয়নি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জেলা প্রশাসক ফরিদ আহাম্মদ জানান, রংপুরের গণপূর্ত বিভাগের আওতাধীন সরকারি ও আধাসরকারি ভবন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবহার উপযোগী কি না তা শনাক্ত করা এবং যেগুলো ব্যবহার উপযোগী নয় তা পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য অতি শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
 
রংপুর ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, ৩ ধরনের ঝুঁকিতে থাকা ৩টি অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে রংপুর অঞ্চল। তিনি আরও বলেন, অগ্নিনির্বাপক আইন ২০০৩ সালের ৭ ও ৮ ধারা অনুযায়ী ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়নি। ২০০৩ সালের আগে যে সকল ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল সেগুলোকে ওই আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও কেউ তাতে কর্ণপাত করেননি। বহুতল ভবন নির্মাণের আগে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করে তা মহাপরিচালক বরাবরে পাঠিয়ে নকশার অনুমোদন নেয়ার বিধান থাকলেও উল্লিখিত ভবন মালিকরা সেই বিধান মানেননি। তিনি আরও জানান, উল্লিখিত ভবনগুলোর ত্রুটি উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক বরাবর পত্র পাঠানো হয়েছে।
 

গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বাহাদুর আলী বলেন, পরিত্যক্ত ভবনগুলো ভেঙে ফেলার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। ভাঙার ক্ষেত্রে যে সরকারি সহযোগিতা দরকার তা চেয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে পত্র পাঠানো হয়েছে।