যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে এটা খুব বেশি দিনের নয়- বললেন বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর মি. হেলাল রহমান।
তিনি জানান, ১৯৭৬-‘৭৮ সাল দু’বছর প্রতিসপ্তাহে রবিবার লন্ডনের ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এনএফ) নামের একটি বর্ণবাদী দল বাঙালিদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালাতো। অবশ্য এর পরে জন্ম হয় অপর বর্ণবাদী দল ন্যাশনাল ডিফেন্স লিগ (ইডিএল)। এই বর্ণবাদী হামলায় ১৯৭৮ সালে শহীদ হন আলতাফ আলি নামের এক যুবক। এর প্রতিবাদে বাঙালি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে একত্রিত হন বাংলাদেশিরা। এসময়ে প্রায় ১০ হাজারের বেশি লোক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে ভিক্ষোভ করেন। এখান থেকে যাত্রা শুরু বাংলাদেশিদের মূল ধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় বাঙালি।
তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে প্রথম দু’জন বাংলাদেশি কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ব্যরিস্টার আসিক আলি লেবার দল থেকে পূর্ব লন্ডনের ওয়াপিং ওয়ার্ডে এবং স্পিটাল ফিল্ডে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন মি. নুরুল হক।
লন্ডন থেকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক পত্রিকা’ সম্পাদক মি. এমাদুল হক জানান, যুক্তরাজ্যে মোট কতজন বাংলাদেশী কাউন্সিলর রয়েছেন তার সঠিক খতিয়ান নেই। গত বছর নির্বাচিত হয়েছিলেন ৫০ জন। তবে ওয়েব সাইটের এক তথ্যে বলা হয়েছে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত কাউন্সিলর রয়েছেন ৫৬ জন। এরমধ্যে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়েছেনএর অর্ধেক সংখ্যক।
এই ধারাবাহিকতার গলি ধরে ২০১০ সালে প্রথম ব্রিটিশ-বাংলাদেশী হিসেবে নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হন লুত্ফুর রহমান। একই বছর হাউস অব কমন্সে এমপি নির্বাচিত হন রুশনারা আলী। বর্তমানে লুত্ফুর রহমান নানা অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। আর আগামী ৭ মে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মত এমপি প্রার্থী হয়েছেন রুশনারা আলী।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট মূলত হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডস দুই ভাগে বিভক্ত। হাউস অব কমন্সের ৬৫০ সদস্য জনভোটে নির্বাচিত হয়। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও নর্দান আয়ারল্যান্ডের জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় নির্বাচন। এ নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তারাই যুক্তরাজ্য সরকার গঠন করার নিয়ম রয়েছে। ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে কোন দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় কনর্জাভেটিভ-লিবডেম মিলে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। যুক্তরাজ্যে ৭টি রাজনৈতিক দল সমধিক পরিচিত ও গণভিত্তি রয়েছে। এরমধ্যে কনর্জাভেটিভ ও লেবার পার্টি সর্ব বৃহৎ দল হিসেবে পরিচিত।
অভিবাসী বিরোধীতায় সকলে একাট্টা
যুক্তরাজ্য এক সময়ে অভিবাসী বান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ২০১০ সাল থেকে কনর্জাভেটিভ পার্টি অভিবাসনের বিরুদ্ধে বিশোধগার করে। এরপর থেকে প্রতিনিয়তই অভিবাসী বিরোধী কমবেশি প্রচারণা করছে প্রায় প্রতিটি দল। ১৯৯৩ সালে ইউকে ইন্ডিপেনডেন্স পার্টি -ইউকিপ গঠন হলেও গত বছর থেকে প্রকাশ্যে এদলটি অভিবাসী বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আসে এবং ব্যাপক পরিচিতি পায়। দলের প্রধান নাইজেল ফারাজে এমইপি বারবার ঘোষণা দেন তার দল ক্ষমতায় গেলে অভিবাসী মুক্ত যুক্তরাজ্য গড়বে। ফলে বিভিন্ন সময়ের জরিপে দেখা যায় পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় এবছর তাদের জনসমর্থন দ্রুত হারে বেড়েছে।
এবারের নির্বাচনে প্রধান ৪টি ইস্যুর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে অভিবাসী বিতর্ক। লেবার পার্টির বরাবরই অভিবাসী বান্ধব হিসেবে পরিচিতি ছিল। কিন্তু এবার তারা ঠেলায় পড়ে বলতে বাধ্য হয়েছে ক্ষমতায় গেলে তারাও অভিবাসনকে যৌক্তিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।
অভিবাসী সম্প্রদায়ের প্রার্থী ১৬৭, বাংলাদেশি ১১
এতো ধকলের মধ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের অভিবাসী সম্প্রদায়। এবছর সাধারণ নির্বাচনে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর যোগ্য ব্যক্তিরা ৭টি প্রধান দল থেকে ১৬৭ জন এমপি পদে প্রার্থী হয়েছেন।
‘ব্রিটিশ ফিউচার প্রজেক্ট’নামের একটি গবেষণা সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে এবছর হাউস অব কমন্সে অভিবাসী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং নতুন এমপির সংখ্যা দাঁড়াবে অন্তত ৪৪ জন।
প্রধান তিনটি দল থেকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মোট ১২ জন মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে এরবাইরে দলীয় কোন মনোনয়ন ছাড়াও আরো দু‘য়েকজন রয়েছেন। তাদের যেমন গণযোগাযোগ নেই তেমনি আলোচনায়ও নেই। তবে এরমধ্যে স্কটল্যান্ডের অ্যাবার্ডিনশায়ার থেকে লেবার পার্টি থেকে মনোনয়ন পাওয়া সুমন হকের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তাকে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয় গত শুক্রবার। স্থানীয় পত্রিকায় খবর প্রকাশ হয়েছে গত বছর কোন এক সময়ে মাত্রাতিরিক্ত মদপান করে গাড়ি চালানোর সময়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এঘটনায় তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে। এসব কারণেই তার বিরুদ্ধে দল থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
বর্তমানে ১১ জন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নির্বাচনে লড়াই করছেন। এরমধ্যে লেবার পার্টি থেকে ৭ জন, রিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে তিন জন, ও কনজারভেটিভ পার্টি থেকে একজন মনোনয়ন পেয়েছেন। এদের মধ্যে ৫ জন নারী ও ৬ জন পুরুষ।
বিজয়ের সম্ভাবনায় ৩ জন
নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন বাকি রয়েছে। বাংলাদেশী ১১ জনের মধ্যে তিন জনের ক্ষেত্রে বিজয়ের সম্ভানা খুবই বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরা হলেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। তিনি হ্যাম্পস্টেড-কিলবার্ন আসন থেকে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন।
লন্ডনে লেবার পার্টির জন্য ১০ টি আসন সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বলে মনে করেন দলের নির্বাচনী ক্যাম্পেইন গ্রুপ। এরমধ্যে হ্যাম্পসটেড-কিলবার্ন অন্যতম। নানা কারণে এই আসনটি তাত্পর্যপূর্ণ। অস্কার বিজয়ী এবং ইংলিশ সোসাইটিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী গ্লেন্ডা জ্যাকসন এ আসনে ২৩ বছর এমপি ছিলেন। তিনি বিগত সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ৪২ ভোটে তার প্রতিদ্বন্দ্বী টোরি দলের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হন। দীর্ঘ কাল থেকেই এখানে তিনটি রাজনৈতিক দলের সমর্থন বলা যায় প্রায় সমান সমান। লেবার পার্টির ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ, কনজারভেটিভ পার্টির ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দলের ৩১ দশমিক ২ শতাংশ।
এছাড়া ব্রিটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)‘র ০.৬ শতাংশ, গ্রিন পার্টি ১.৪ শতাংশ, ইউকিপ ০.৮ শতাংশ এবং অন্যান্য রয়েছে ০.৫ শতাংশ।
২০১০ সালের নির্বাচনে যুক্তরাজ্যে জাতীয় গড় ভোট কাস্ট ছিল ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং এই আসনে কাস্ট হয় জাতীয় গড় হারের চেয়ে বেশি অর্থাত্ সর্বোচ্চ ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
তিনি ২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে স্থানীয় লেবার পার্টির সদস্য ভোটে বিজয়ী হয়ে দলের মনোনয়ন লাভ করেন।
এ আসনে এসিয়ান ভোটার রয়েছে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। হোয়াইট-ব্রিটিশ ৪০ শতাংশ, অন্যান্য হোয়াইট ২৫ দশমিক ২ শতাংশ, আফ্রিকান ১০ দশমিক ২ শতাংশ এবং বাকি প্রায় ১২শতাংশ রয়েছে অন্যান্য জাতীগোষ্ঠীর। ধর্মের দিক থেকে ক্রিশ্চিয়ান ৩৯ শতাংশ, মুসলিম ১০ দশমিক ৭, হিন্দু ২ দশমিক ৫, ইহুদি ৬ দশমিক ৫, শিখ ০ দশমিক ২ শতাংশ এবং ধর্ম পরিচয়ে অনিহা দেখিয়েছেন তারা ৪২ শতাংশ।
টিউলিপ ভোটারদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নির্বাচিত হলে চিকিত্সা, হাউজিং, শিক্ষা, শিশুদের কেয়ার, কর্মজীবীদের জন্য বেতন বৃদ্ধি সহ এলাকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
উল্লেখ্য, ব্রিটেনে এমন কোন প্রতিশ্রুতি সাধারণত কোন প্রার্থী দেন না যা নির্বাচিত হলে তিনি করতে পারবেন না। বাস্তবতার ভিত্তিতেই প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন এবং তা বাস্তবায়নও করেন। গাফেলতির সুযোগ অন্তত ব্রিটেনে খুবই ক্ষিণ। অবশ্য এই প্রতিশ্রুতি গুলো তার দলের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়েও দেয়া হয়েছে।
রুশনারা আলী: তিনি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। শিশুকালেই লন্ডনে আসেন বাবা-মায়ের সাথে। পূর্ব লন্ডনে বেড়ে ওঠেন। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তিনি ২০১০ সালে পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন-বো আসন থেকে লেবার পার্টি থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে এমপি নির্বাচিত হন। এবারেও একই দল ও এলাকা থেকে বিজয়ের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। তাঁর যোগ্যতম প্রতিদ্বন্দি নেই বলে মনে করেন এলাকাবাসি। অবশ্য তিনি যুক্তরাজ্যে বিগত পার্লামেন্টে একটি বিতর্কিত ইস্যুতে অর্থাত্ সমকামিতার পক্ষে ভোট দেন। এতে সাধারণ মুসলিম ও ক্রিশ্চিয়ান সহ অন্যান্য ধর্মভিরু মানুষ তার প্রতি বিরক্ত হন। কিন্তু তার সমকক্ষ কিংবা উচ্চ যোগ্যতার প্রার্থী না থাকায় এতে কোন প্রভাব পড়ার আশংকা নেই বলে অনেকেই মনে করেন।
তিনি গত মেয়াদে এলাকার উন্নয়নে যেসব কাজ করেছেন তার ফিরিস্তি ছেপে ঘরে ঘরে বিতরণ করার পাশাপাশি দলের কেন্দ্র ঘোষিত ইসতেহার সহ কমিউনিটির উন্নয়নে একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভোটারদের কাছে।
ড. রুপা আশা হক: তিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন লন্ডনের ইলিং এলাকায়। বেড়ে উঠেছেন ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে। ১৯৯১ সালে লেবার দলে যোগ দেন। ২০০৫ সালে চেশাম-এমারশাম আসনে দলের মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হতে পারেননি। ২০১০ সালেও নির্বাচন করে হেরে যান। হাল নির্বাচনে তিনি লেবার পার্টি থেকে লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনের প্রার্থী। এবারে তাঁর বিজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এআসনটিও লেবার দলের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি আসনের একটি। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়।তিনি কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের সিনিয়র প্রভাষক। তাঁর আদি বাড়ি পাবনায়। উল্লেখ্য, বিখ্যাত ব্লুপিটারের উপাস্থাপিকা কনি হক তার ছোট বোন।
অন্যরা হলেন- মেরিনা আহমেদ, মিনা রহমান, প্রিন্স সাদিক চৌধুরী, আনওয়ার বাবুল মিয়া, আলী আখলাকুল, এমরান হোসাইন, আশুক আহমদ ও মোহাম্মাদ সুলতান।
