আজ রাত পোহালেই ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল রবিবার রাত ১২টায় শেষ হয়েছে ঘটনাবহুল ১৯ দিনের প্রচারযুদ্ধ। তিন সিটিতে মেয়র পদে ৪৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলেও ধারণা করা হচ্ছে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে। এই নির্বাচন নির্দলীয় হলেও দৃশ্যত এটি রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
নির্বাচনকে সামনে নিয়ে দুই জোটের দুই প্রধান নেত্রী সংবাদ সম্মেলন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের বিষয় ভিন্ন হলেও চলমান রাজনীতিই প্রধান্য পেয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দল সমর্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে উত্সাহ-উদ্দীপনা। অন্যদিকে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে উত্কণ্ঠা। সরকার দলীয় সমর্থকরা সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামলেও বিরোধীদলীয় সমর্থকদের প্রচারণা ছিল ঢিলেঢালা। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থীসহ তাদের অসংখ্য কাউন্সিলর প্রার্থী এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন।
সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে বলে দাবি করেছে। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেছেন, অতীতের যেকোন সিটি নির্বাচনের তুলনায় তিন-চার গুণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাঠে থাকবে। র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমদ জানিয়েছেন, তিন সিটির ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর নিরপত্তার দায়িত্বে থাকবে র্যাব। নির্বাচনে শুধু র্যাবেরই ৫ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করবে।
সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের জন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ দায়িত্বে থাকবে ৮২ হাজার নিরাপত্তা সদস্য। ২৬ এপ্রিল থেকে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত থাকলেও নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, সেনাবাহিনী রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে ক্যান্টনমেন্টে আছে, প্রয়োজনে তারা মাঠে নামবে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য ১৬ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিন সিটিতে ১০৫ প্লাটুন বিজিবি সদস্যকে টহলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া ৭ প্লাটুন কোস্টগার্ড মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে থাকবে। এরা মূলত তিন সিটির নৌপথকেন্দ্রিক ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তা দেখভাল করবে। নির্বাচন উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে সবধরনের যান চলাচলের ওপর। ভোটকেন্দ্রগুলোতে গতকাল থেকেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে নির্বাচনী সামগ্রী পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে। কমিশন ঢাকা উত্তরের জন্য বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে, ঢাকা দক্ষিণের জন্য মহানগর নাট্যমঞ্চে এবং চট্টগ্রামের জন্য জিমনেসিয়ামে ফলাফল ঘোষণার কেন্দ্রে স্থাপন করেছে।
উত্তর সিটিতে ১০৯৩ ও দক্ষিণ সিটিতে ৮৮৯ মোট ১ হাজার ৯৮২টি কেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৪২৯টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ (ঝূঁকিপূর্ণ) কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামের মোট ৭১৯টির মধ্যে ৫৯৫টি ভোট কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানান হয়েছে, এসব কেন্দ্রে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সেনারা প্রস্তুত থাকবেন
১৬ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে
শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা থেকে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতি সিটিতে এক ব্যাটালিয়ন (৭৪১ জন) সেনা সদস্য ২৬ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। সেনানিবাসের অভ্যন্তরে তারা রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে অবস্থান করবেন। রিটার্নিং অফিসারের অনুরোধে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন। সেনা সদস্যরা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বেসামরিক প্রশাসনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করবে। সেনা সদস্যদের সঙ্গে ১৬ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। মিরপুর সেনানিবাসে ২ জন, পোস্তগোলা সেনানিবাসে ২ জন, ঢাকা সেনানিবাসে ৬ জন, চট্টগ্রামের দামপাড়া সেনানিবাসে ২ জন, হালিশহর সেনানিবাসে ২ জন এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ২ জন মোট ১৬ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অবস্থান করবেন এবং সেনা সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন। যদিও আগে বলা হয়েছিল রিটার্নিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।
ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা
প্রতিটি সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ২২ জন ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন পুলিশ ও আনসার দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়াও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে তিন সিটিতে (১০৫ প্লাটুন) ৩ হাজার ৪০০ জন বিজিবি, ২৩৮ জন (৭ প্লাটুন) কোস্টগার্ড, র্যাবের ২৬৮টি টিম অর্থাত্ ২ হাজার ১৪৪ জন (৮ জনের টিম), পুলিশ ১০৫৬ জন মোতায়েন থাকছে। এছাড়াও তিন সিটিতে ৮টি করে মোট ২৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্যকে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে রাখা হয়েছে।
ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ
তিন সিটিতে ৮৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্সের সঙ্গে ৩৪১ জন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে থাকবেন। একইসঙ্গে উত্তর সিটিতে ৯ জন, দক্ষিণ সিটিতে ১৪ জন এবং চট্টগ্রামে ১০ জন মোট ৩৩ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচনী দায়িত্ব পাওয়া ম্যজিস্ট্রেটদের জন্য এক ব্রিফিংয়ে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমান বলেছেন, আপনাদের হূদয়ের পরিবর্তে মাথা খাটিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অনুষ্ঠানে ইসি কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেছুর রহমান সিইসি’র বরাত দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে সেনা সদস্যদের ডাকা হবে। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে। গতকাল রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
পর্যবেক্ষণ করবেন বিদেশিরা
সিটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন ঢাকাস্থ বিভিন্ন দূতাবাস ও দাতা সংস্থা। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, সুইডেন, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএসএইড, ইউকেএইড, ডিআই, এনডিআইসহ বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা পর্যবেক্ষণের জন্য ইসি থেকে পর্যবেক্ষক কার্ড সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপসহ বিভিন্ন এনজিও ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার দেশীয় প্রায় ৪ হাজার পর্যবেক্ষক এই নির্বাচন পর্যবেক্ষক করতে যাচ্ছেন।
ইসিতে অভিযোগের স্তূপ
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনে শতাধিক প্রার্থী আবেদন করেছেন। কেউ কেউ কেন্দ্র দখলের আশংকা করে বলেছেন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকবে। তারা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদারের আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রার্থীরা।
নির্বাচন কমিশনে ১৪ দল
নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া পরিকল্পিতভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ এনেছে ১৪ দল। গতকাল রবিবার সকালে ১৪ দলের একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কাছে এ অভিযোগ করেন। লিখিত ওই অভিযোগটি ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের স্বাক্ষরে দেয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, খালেদা জিয়া গত কয়েকদিন ধরে সহস্র নাগরিক কমিটি সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাস, নাশকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এছাড়া বেআইনিভাবে মোটর শোভাযাত্রা নিয়ে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম পরিচালনাসহ নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছেন। যা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করার প্ররোচনা ও উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের নামান্তর। অভিযোগপত্রে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে ধরে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে ১৪ সদস্য বিশিষ্ট ওই প্রতিনিধি দলটি সিইসি’র সঙ্গে বৈঠক করেন। সকাল দশটায় শুরু হয়ে বৈঠকটি শেষ হয় পৌনে এগারটায়। ওই প্রতিনিধি দলের সদস্য ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি সাংবাদিকদের বলেন, সিটি নির্বাচনে খালেদা জিয়া নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেন। এমনকি নির্বাচনের ফলাফলও অস্বীকার করতে পারেন তিনি। এ বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনকে আহবান জানিয়েছি। এ সময় অন্যদের মধ্যে জাসদ নেতা শিরিন আকতার, গণতন্ত্রী পার্টির নেতা ড. শাহাদাত হোসেন, ন্যাপের নেতা ইসমাঈল হোসেন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের নেতা ড. ওয়াজেদুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
কিছু পর্যবেক্ষক সংস্থায়
আপত্তি বিএনপির
বিএনপি অভিযোগ করেছে, সিটি নির্বাচনে ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে যার মধ্যে ৪/৫টি ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার এখিতয়ার, দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় তিন সদস্যের প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কাছে দেয়া বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পাদক এম আসাদুজ্জামান রিপন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ অভিযোগ করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ‘সরকারের বিধিবদ্ধ সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত এসব প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার এখতিয়ার আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। ‘মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থা-মওসুস নামের একটি একক প্রতিষ্ঠানকে শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে ৫শ পর্যবেক্ষক প্রদানের অনুমোদন দেয়া হয়েছেন। যা রহস্যজনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সংগঠনটি নির্বাচন কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার জন্য দাবি জানিয়েছে বিএনপি।