তামিম-ইমরুল বীরত্বে মহাকাব্যিক ড্র

আপডেট : ০৩ মে ২০১৫, ১৬:১৬

অপরাজিত দুই ব্যাটসম্যান সাকিব আল হাসান ও শুভাগত হোম পাকিস্তানি ফিল্ডারদের সঙ্গে হাত মেলানো শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারিতে শুরু হলো বিজয়োল্লাস। পতাকা দুলিয়ে, প্ল্যাকার্ড নেড়ে উল্লাস প্রকাশ করতে থাকেন দর্শকরা। মনে হল, বাংলাদেশ বুঝি টেস্ট জিতে গেছে!

 
না, খুলনা টেস্টটা জেতেনি বাংলাদেশ; ড্র করেছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের ইতিহাসে প্রথম ড্র।
 
সেই ড্র করার ভঙ্গিটা এতোই বীরোচিত যে, একে জয়ের চেয়ে বড় বলে উল্লেখ করলেও দোষের কিছু হবে না। তামিম ইকবালের প্রথম, বাংলাদেশের দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি এবং ইমরুল কায়েসের ১৫০ রানে ভর করে হারতে বসা ম্যাচে রীতিমতো চালকের আসনে বসে তবে ড্রয়ের মীমাংসা মানলো বাংলাদেশ। তার আগে উদ্বোধনী জুটিটি ভুরি ভুরি রেকর্ডও জন্ম দিয়েছে।
 
পাকিস্তানের প্রথম ইনিংসের চেয়ে ২৯৬ রান পেছনে থেকে চতুর্থ দিন লাঞ্চের আগেই ব্যাট করতে নেমেছিলো বাংলাদেশ। এখান থেকে দলের সামনে পথ ছিলো দুটো—প্রায় সাড়ে পাঁচ সেশন নিজেরা কোনোক্রমে আত্মরক্ষা করে চলা, নতুবা আত্মসমর্পণ করা।
 
এই দুই পথের কোনটিতেই হাঁটেননি তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েস। এই বিশাল পাহাড় সমান রানে পিছিয়ে থেকে যেটা সবচেয়ে অস্বাভাবিক কাজ, সেই পাল্টা আক্রমণ শুরু করলেন। এই আক্রমণে বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। উইকেটে বেশ টার্ন পাচ্ছিলেন পাকিস্তানি স্পিনাররা, ওয়াহাব রিয়াজ রিভার্স সুইং করাচ্ছিলেন। কিন্তু এসব বিপদকে একেবারে ছেলেখেলা বানিয়ে ফেললেন তামিম ও ইমরুল।
 
চতুর্থ দিনে ওভারপ্রতি প্রায় সাড়ে চার করে রান তুলে ব্যাট নামের তরবারী চালালেন। ওই দিনের খেলা শেষ হতেই বোঝা গেল, আত্মসমর্পণ তো নয়ই; উল্টো শক্ত হয়ে বসতে চলেছে বাংলাদেশ। দিনশেষ হওয়ার আগেই সেঞ্চুরি করে ফেললেন দুই ওপেনারই। এই নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বার বাংলাদেশ দেখলো দুই ওপেনারের সেঞ্চুরি। আগেরবারও এই দু’জনই করেছিলেন।
 
৩১২ রানের মাথায় এই জুটি ভাঙলো ইমরুল কায়েসের ১৫০ রানে বিদায়ে। এই নিয়ে টানা চার টেস্টে ৩ সেঞ্চুরি করলেন ইমরুল। ২৪০ বলে ১৬টি চার ও ৩টি ছক্কায় সাজানো ইনিংস খেলে বিদায় নিলেন ইমরুল।
 
এর আগেই বাংলাদেশ পার করে ফেলেছে পাকিস্তানের লিড। কোনো উইকেট না হারিয়ে প্রতিপক্ষের সর্বোচ্চ লিড পার করার রেকর্ড এখন এটাই।
 
ইমরুলের বিদায়ে রেকর্ডবহুল এই জুটির শেষ হলো। দেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বকালের সেরা জুটি এবং বিশ্বের টেস্ট ইতিহাসেরই দ্বিতীয় ইনিংসের সেরা উদ্বোধনী জুটি করলেন তামিম-ইমরুল। দেশের সর্বোচ্চ টেস্ট জুটিটি এর আগে ছিলো মুশফিকুর রহিম ও মোহাম্মদ আশরাফুলের। ২৬৭ রানের সে জুটিতে অনেক অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেন চতুর্থ দিনেই তামিম-ইমরুল। প্রথম উইকেটে ভেঙেছিলেন নিজেদেরই ২২৪ রানের জুটি।
 
৩১২ রানের এই জুটি করার পথে বিশ্বের এক ইতিহাসও পেছনে ফেললেন তামিম ও ইমরুল। দ্বিতীয় ইনিংসে এর আগে সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটি ছিলো কলিন কাউড্রে ও পুলারের ১৯৬০ সালে করা ২৯০ রান। তাদেরও হারালেন এরা ২২ রানের ব্যবধানে!
 
জুটি এখানে থামলেও তামিম থামেননি। শেষ পর্যন্ত ২০৬ রানে যখন আরেক ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হাফিজের বলে স্টাম্পিংয়ের শিকার হয়ে থামলেন; ততক্ষণে দেশের সর্বোচ্চ রানের মালিক হয়ে গেছেন। এই ২০৬ রানের ইনিংস খেলার ভেতর দিয়ে অনেকগুলো রেকর্ড নিজের করে ফেললেন তামিম। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংসের মালিক হলেন তামিম ইকবাল। দেশের হয়ে সব ফরম্যাটে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সর্বোচ্চ স্কোর তার—টেস্টে ২০৬, ওয়ানডেতে ১৫৪ ও টি-টোয়েন্টিতে ৮৮*।
 
আর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ যখন ৬ উইকেটে ৫৫৫ রান তুলে ড্র মেনে নিল, তখন দলীয় কিছু রেকর্ডও চাপা পড়ে গেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে এটা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। এর আগে ২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪১৩ রান করেছিলো বাংলাদেশ।
 
শেষ বেলায় সাকিব আল হাসান অপরাজিত ৭৬ রান করে পুঁজিটাকে আরও বড় করে তুললেন।