হিরু যখন বইয়ের পাঠক

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩২

সদ্য শেষ হওয়া বইমেলার ঘটনা। বইমেলায় গিয়ে হিরু নিজের মতো করে কিছু বই কিনেছে। কোনোটা সে আগেই ক্যাটালগ দেখে লিস্টি করেছে। কোনোটা বা ফেসবুকে বিভিন্ন বইয়ের গ্রুপে লেখকের ফেক আইডি, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষীদের দিয়ে করানো পোস্ট দেখে প্রভাবিত হয়ে কিনেছে। কোনোটা বা বইমেলায় গিয়ে বই উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখে তারপর কিনেছে। যদিও ব্যাপারটা শেষমেশ লেখাকে নয়, বরং লেখককে দেখে বই কেনার মতোই হয়, তবুও কী-ই বা করার! বই পড়েই নাহয় লেখককে চিনবে সে। এই পদ্ধতিটা হিরুর কাছে র্যানডম বাছাইয়ের মতো। চার হাজার, সাড়ে চার হাজার বইয়ের ভিড়ে নিজের পছন্দের লেখকের লেখার বাইরে অন্যদের লেখা পড়তে গেলে এর বিকল্প আর কী হতে পারে!

হিরু যখন একটি স্টলে বই উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখছিল, সে আড়চোখে দেখল স্টলের ভিতরে বসা জনৈক তরুণ তার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। হিরু কখনো বই পড়ে শেষ করার আগে বইয়ের পিছনের ফ্ল্যাপে লেখক পরিচিতি পড়ে না। তাতে নাকি লেখকের প্রতি তার মুগ্ধতা বই পড়ার আগেই কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফ্ল্যাপের ছবি না দেখলেও হিরুর বুঝতে অসুবিধা হলো না—স্টলের ভিতরে বসে বই বিক্রি না করে, এভাবে ‘মাছি তাড়ানো’য় ব্যস্ত লোকটি লেখক ব্যতীত আর কেউ হতেই পারে না!

হিরু বইটি রেখে চলে এলো। ইচ্ছে করেই। দূর থেকে সে খেয়াল করল—সেই তরুণ বসেই আছে। চুপচাপ। এই মুহূর্তে তার বইয়ের কোনো পাঠক উপস্থিত নেই। কিংবা তার বই-ই চলছে না।

হিরু আবারও স্টলে গেল। বইখানা কিনে নিল। তারপর চুপচাপ পাশের স্টলের অভিমুখে পা বাড়াল।

তখনই পিছন থেকে ডাক এলো, ‘ভাই, অটোগ্রাফ না নিয়েই চলে যাচ্ছেন যে...।’

‘আমার অটোগ্রাফের দরকার নাই।’ হিরু লাজুক বদনে বলল।

লেখক স্টলের ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো, ‘আমি দেব।’

‘প্লিজ ভাই, আমি নেব না।’ হিরু যেন বিনয়ের অবতার।

লেখক এবার হিরুকে পয়সা দিতে চাইল। তবুও তার অটোগ্রাফ দেওয়া চাই। পাশাপাশি কয়েকখান সেলফি হলে তো আরও ভালো!

হিরু তবুও রাজি হলো না। লেখক এবার দোকান থেকে আরেকটা বই নিয়ে এলো। ‘ওটা যেহেতু আপনি আপনার গাঁটের পয়সা খরচা করে নিয়েছেন, তাই আপনার কথাই সই। ওটাতে অটোগ্রাফ দেবো না। কিন্তু এই বইটা আমার তরফ থেকে আপনাকে উপহার দিলাম। এবার এটাতে অটোগ্রাফ নিন।’

‘আপনার থেকে আমি কোনো উপহার নেব না। কারণ, আপনাকে আমি চিনি না।’ হিরু মুখের ওপর না করে দিল।

তরুণ লেখকের মুখখানা চুপসে গেল। কী বলবে ভেবে পেল না সে।

হিরু বলল, ‘ভাই, আপনার বইটা আমি পড়ার জন্য নিয়েছি। অটোগ্রাফ নিয়ে, সেলফি তুলে তারপর ফেলে রাখার জন্য নয়। বইটা পড়ে ভালো লাগলে আমিই তখন আপনাকে খুঁজে নেব। আপনার অটোগ্রাফ তো নেবই। আপনার সঙ্গে ছবিও তুলব তখন। তারপর আমি নিজে থেকেই আপনার বইয়ের প্রচার করব।’

লেখকের মুখ ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হলো। হিরু স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু কিছু অংশ পড়েছে। পড়ে ভালো লেগেছে বলেই তার বইটি কেনা। সে একমুহূর্ত ভেবে বলল, ‘আপনার মোবাইল নম্বরটা হবে?’

তরুণ লেখক মুচকি হেসে বলল, ‘সেটা বরং আপনিই কষ্ট করে সংগ্রহ করে নিয়েন।’

হাসিটা হিরুর মাঝেও সংক্রমিত হলো। এমন আত্মবিশ্বাসী লেখকই তো সে চায়।

দুই.

বইমেলায় হিরুর পরিচিত যারা বিভিন্ন লেখকের বই নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে, সে একে একে তাদের বাসায় গিয়ে হাজির হলো।

‘কীরে, বই না পড়ে ফেসবুকিং করছিস যে!’

‘এখন কি আর বই পড়ার মতো টাইম আছে!’ কথাটা বলল বইমেলার সময় বই নিয়ে অনেক অ্যাক্টিভিটিজ দেখানো একজন।

হিরু অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘তাহলে কি তুই বইমেলার মাসেই সব বই পড়ে ফেলেছিস?’

‘না। এত সময় কই। বই পড়তে গিয়ে যদি গার্লফ্রেন্ডকে সময় দিতে না পারি, তাহলে তো খোদ গার্লফ্রেন্ডকেই হারাতে হবে!’

‘তাহলে বইমেলার মাসে যে তুই একেকজনের বই নিয়ে চমত্কার চমত্কার সব স্ট্যাটাস দিতিস! স্ট্যাটাসগুলো বই পড়ে তারপরে দিসনি?’

‘আরে! তুই কি পাগল হলি! ওনাদের নিয়ে আমাকে পোস্ট এমনিতেই দিতে হতো। এবং অবশ্যই সেটা পজেটিভ কিছু লিখে। তাহলে শুধু শুধু বই পড়তে যাব কোন দুঃখে! বই পড়লে ভালো লাগা, খারাপ লাগা দুটোর যেকোনো একটাই ঘটতে পারে। আর বই না পড়লে কেবলই মুগ্ধতা আর মুগ্ধতা!’ এই বলে ফিক করে হেসে দিল সে।

হিরুর মুখে কথা নেই। অনেকক্ষণ লাগল তার ধাতস্থ হতে। কতক্ষণ পর সে বলল, ‘তাহলে শুধু শুধুই তাদের বইগুলো কিনলি?’

‘তাদের বই কিনেছি। অটোগ্রাফ নিয়েছি। এসব আমার কাছে লাভজনক প্রজেক্ট নয়। লাভজনক প্রজেক্ট হলো—তাদের সাথে তোলা ছবি। সেই ছবি যখন ফেবুতে পোস্ট দিয়েছি, তখন আমার ফ্যানরা মুগ্ধ হয়েছে। তারাও আমাকে সেলিব্রেটি ভাবতে শুরু করেছে। আর সবচেয়ে লাভজনক প্রজেক্টটা হলো—তাদেরকে নিয়ে অর্থাত্ তাদের বই নিয়ে যখন ভালো ভালো কথা লিখেছি, তারা সেই পোস্ট তাদের ওয়ালে অ্যাপ্রুভ করেছে। কখনো কখনো শেয়ার করেছে। তখন আমার ফ্যান-ফলোয়ার হু হু করে বেড়েছে!’

বিস্মিত হিরু আরেকটা প্রশ্ন না করে পারল না, ‘এত কিছু করে আদতে তোর কী লাভ হলো! সম্পর্কোন্নয়ন?’

‘তা হয়েছে বটে। তবে, আসল কাহিনি ভিন্ন। দুদিন পরে আমি নিজেও লেখালেখি শুরু করব। তাই আগেভাগেই ভক্তসংখ্যা বাড়িয়ে নিচ্ছি। জানিসই তো—এখন যে যত বড় সেলিব্রেটি, অর্থাত্ ফেসবুকে যার যত বেশি ফলোয়ার, তার বই তত বেশি চলে!’

এরপরে হিরুর মুখে আর কোনো কথাই ফুটল না।

 

 

তিন.

বাজারে গিয়ে হিরু একটা সুন্দর পিঠব্যাগ কিনল। আর কিনল একটা আঠা। ফিরে এসে কয়েক সেট পোশাক আর আঠাটা ব্যাগে ভরে নিল সে। বাসায় জানাল—মোটামুটি কয়েক মাসের সফরে যাচ্ছে। খুব শিগগিরই দেখা হচ্ছে না।

বাসার মানুষ অবাক। হিরু কি তবে বিশ্বভ্রমণে বেরোচ্ছে? হিরু রহস্যময় হাসি হেসে তাদেরকে রহস্যের মাঝে রেখেই বেরিয়ে পড়ল।

প্রথমেই সে গেল তার খালার বাসায়। ‘খালাম-মা-আ-আ,’ দীর্ঘ টেনে বলল সে, ‘এতদিন আসিনি বলে সে কী অনুযোগ। এবার আর যাচ্ছি না। ন্যূনতম একমাস থাকব। কী কী খাবারের আয়োজন করবেন, এবার করেন!’

খালা মায়ের মতোই। তিনি খুশিই হলেন। কিন্তু তার খালাতো ভাই-বোনেরা অবাক। অবাক হিরুর খালুও। এই যুগে এক মাস বেড়াতে এসেছে!

‘তুমি ল্যাপটপ এনেছ?’ ‘তোমার মোবাইল কোথায়?’ প্রশ্নগুলো তার কাজিনেরা সঙ্গে সঙ্গেই করে বসল। কেননা, এ যুগে কোনো তরুণ এসব ছাড়া কোথাও থাকবে—ভাবাই যায় না। কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে করে যে বিরক্ত হবে, তারও উপায় নেই। ফেসবুকে ঢুকে সময়টা মুহূর্তেই কাটিয়ে দিতে পারছে।

হিরু স্মিত হেসে বলল, ‘আমি ল্যাপটপ আনিনি। ল্যাপটপে তেমন কোনো কাজও নেই। আর মোবাইল বলতে যা বুঝায় (স্মার্টফোন), তাও আনিনি। একখানা পলিফোনিক রিংটোনওয়ালা ফোন আছে। তবে কারওর চিন্তার কিচ্ছু নেই। ফোনটা আওয়াজ করবে না। সারাক্ষণ সাইলেন্ট মুডেই থাকবে।’ হিরু বুঝেও অন্যভাবে উত্তরটা দিল।

অন্যদের মুখে কোনো কথা নেই। তারা ভেবে পাচ্ছে না—এসব ছাড়া কিভাবে এতগুলো দিন থাকবে সে!

অনেকক্ষণ বাদে হিরুর খালাতো বোনটি মুখ খুলল, ‘আম্মু, টিভিতে আমার পছন্দের সব অনুষ্ঠান সম্প্রচার হচ্ছে এ মাসে। টিভির রিমোটে আমি ছাড়া আর কেউ যেন হাত না দেয়!’ হিরুকে পরোক্ষভাবে ‘টিভির সামনে না বসার’ বার্তা দিয়ে রাখল সে।

‘পিসিতে আমাকে অনেক ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করতে হচ্ছে। আম্মু, পিসিটা যেন কেউ না ধরে।’ হিরুর খালোতো ভাইটিও সেম কাজ করল।

হিরুর খালু এসব পাশ কাটানো কথায় গেলেন না। তিনি বললেন, ‘বাসায় একটা নষ্ট স্মার্টফোন আছে। ডিসপ্লে আর কী সব জানি গ্যাছে। ওটা ঠিক করে এ কয়দিন চলতে পার। অন্যগুলো কেউ তোমার সাথে শেয়ার করবে বলে আমার মনে হয় না!’

হিরু কিছু না বলে শুধু মুচকি করে একটু হেসে তার জন্য নির্ধারিত রুমটিতে ঢুকে পড়ল।

কয়েকঘণ্টা পরে বাসার সবার কৌতূহল চরমে পৌঁছল। হিরুর বেরোনোর কোনো নামগন্ধ নেই। এভাবে একটা জোয়ান ছেলে রুমের মধ্যে কীভাবে পড়ে থাকে!

‘অলস! পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে নাকি!’ হিরুর খালু নিজেকে শোধালেন!

হিরুর খালোতো বোন আর ভাইটি রুমের ভিতরে উঁকিঝুঁকি মেরেও কিচ্ছু বুঝতে পারল না। কতক্ষণ পরে হিরুই বেরিয়ে এলো। হাতে একটা বই। কারওর দিকে না তাকিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে গেল সে।

ড্রয়িং রুমে কয়েকটা বুকসেলফ। অসংখ্যা বই। সবগুলোই দামি দামি—হোক দামে কিংবা লেখকের নামে! কিন্তু দেখলেই বোঝা যায়, ওতে বহুদিন হলো কারওর হাত পড়েনি।

হিরু তার হাতের বইটা সেলফের এককোণে রেখে আরেকটা বই তুলে নিল। সেটা দেখিয়ে সে বলল, ‘আপনারা তো আর এটা পড়বেন না এখন? আমি পড়ি?’

‘না, ওটা পড়ব আমি।’ এই বলে হিরুর খালাতো বোনটি বইটি নিয়ে নিল।

হিরুর আরেকটা বই বের করতেই খালাতো ভাইটিও সেটি প্রায় ছিনিয়েই নিল।

হিরু মুচকি হেসে এবারে আরেকটা বই বের করল। ‘তাহলে এটা পড়ি আমি?’

এবার কারও মুখে কোনো কথা নেই।

কতক্ষণ বাদে হিরুর খালু বললেন, ‘বইগুলো নষ্ট করে ফেলো না যেন! পড়তে গেলে তো ভাঁজ নষ্ট হয় যাবে।’

হিরু জবাব না দিয়ে রুমের ভিতরে চলে গেল। একটু পরে আবার ফিরেও এলো সে। সেই আঠাটা হাতে।

‘চিন্তা করবেন না, খালুজান। পড়তে গিয়ে যদি বইগুলো নষ্টও হয়ে যায়, তাহলে সেগুলোকে কিভাবে নতুনের মতো করে তোলা যায়, সেই কৌশল আমার জানা।’ আঠাটা দেখাল সে। ‘আজ তেশরা মার্চ। আশা করছি আগামী এক মাসের মধ্যেই সবগুলো বই পড়ে ফেলতে পারব। তারপর, মিশন ‘কাকার বাসা’! আর, জানেনই তো আজ ‘বিশ্ব বই দিবস’। সবাইকে বই দিবসের শুভেচ্ছা।’ এই বলে আবারও রুমের ভিতরে ঢুকে পড়ল সে।

অন্যরা ততক্ষণে তাদের বুকশেলফে সাজিয়ে রাখা বইগুলোর মতোই শো-পিস হয়ে গেছে!