সারপ্রাইজ

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ১৯:৪২

দুপুর ২টা বাজে। রিয়াদ আর তার প্রেমিকা প্রমা পার্কের একটা বেঞ্চিতে বসে আছে। বসে বসে দুজন মিলে সমানতালে বাদাম চিবোচ্ছে। বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে প্রমা কথা বলছে, ‘অ্যাই, শুনো। অন্যান্যদিন তুমি আমায় রেস্টুরেন্টে ট্রিট দাও। কোনো উপলক্ষ ছাড়াই ভালোবেসে আজ আমি তোমায় ট্রিট দেব।’

চারদিকে গাছপালায় ঘেরা বেঞ্চিতে বসার কারণে রিয়াদের বেশ শীত শীত লাগছিল। প্রমার মুখে রেস্টুরেন্টে খাওয়ানোর কথা শুনে রিয়াদের শরীরটা হঠাত্ গরম হতে শুরু করল। রিয়াদ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে প্রমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘সত্যি! তুমি আমাকে রেস্টুরেন্টে খাওয়াবা?’ প্রমা বলল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই। শুধু খাওয়াবই না। সাথে সাথে আমার তরফ থেকে তোমার জন্য বিশাল একটা সারপ্রাইজও থাকছে। এতসব আয়োজনের পিছনের কারণ অবশ্য একটাই। আমি তোমায় খুব ভালোবাসি রিয়াদ।’

প্রমা সত্যি সত্যিই রেস্টুরেন্টে খাওয়াবে রিয়াদের এমনটা বিশ্বাস হতে চাচ্ছে না। রিয়াদ আর প্রমার সম্পর্কের প্রায় এক বছর হতে চলল। এই দীর্ঘ সময়ে প্রমা একদিনও রিয়াদকে কিছু কিনে খাওয়ায়নি। রিয়াদের সাথে থাকা অবস্থায় প্রমা কিছু কিনলে বিলটা রিয়াদ দেবে, এটাই যেন তাদের সম্পর্কের অলিখিত নিয়ম। রিকশা ভাড়া, বাদাম, চটপটি, ফুচকা কেনার টাকা, রেস্টুরেন্টের খাবার বিল সবকিছু রিয়াদই দেয় সবসময়। অলিখিত এই নিয়মটার আজ ব্যতিক্রম হচ্ছে দেখে রিয়াদ খুবই অবাক হলো। পার্কে আসার পরপরই প্রমা পাঁচ টাকার বাদাম কিনেছে। পাঁচ টাকার বাদাম কেনার পর থেকে প্রমা অন্তত পঁচিশ বার গর্ব করে বাদাম কেনার কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছে।

হাঁটতে হাঁটতে রিয়াদ আর প্রমা একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল। বিলের পরিমাণ কমানোর জন্য অন্যদিন হলে রিয়াদ সাধারণ মানের একটা রেস্টুরেন্টে যেত। কিন্তু আজকে তো বিল নিয়ে রিয়াদের কোনো টেনশন নেই। বিলটা প্রমা দিচ্ছে। রিয়াদ চাইনিজ রেস্টুরেন্টটার দিকেই পা বাড়াল। প্রমাও রিয়াদের সাথে সাথে হাঁটছে।

রেস্টুরেন্টের চেয়ার টেনে বসতেই অর্ডার নেওয়ার জন্য ওয়েটার এগিয়ে এলো। প্রমা রিয়াদকে বলল, ‘তোমার যা ইচ্ছা, যতটুকু ইচ্ছা খেতে পারো। বিল নিয়ে কোনো টেনশন করো না।’ প্রমার মুখে এমন কথা শুনে রিয়াদ একের পর এক অর্ডার দিতে শুরু করল। বার্গার, গ্রিল, পাস্তা, পিজ্জাসহ কিছুই যেন সে বাদ দিতে চাইছে না। পারলে রেস্টুরেন্টে থাকা সব আইটেমই সে অর্ডার করে ফেলে—অবস্থাটা এরকম। রিয়াদ মনে মনে ভাবছে, সুযোগ সবসময় আসে না। একবার যখন এসেছে, তখন সেটা হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না। প্রমা এতদিন পর্যন্ত রিয়াদের যা টাকা খরচ করিয়েছে, রিয়াদ আজকে একদিনেই সেটা তুলে ফেলবে।

অর্ডার দেওয়ার আধা ঘণ্টা পার হতেই খাবার চলে এলো। হাত-মুখ ধুয়ে রিয়াদ রাক্ষুসে দৈত্যদের মতো খাওয়া শুরু করল। রিয়াদের খাওয়ার ভঙ্গি দেখে প্রমার মনে হতে লাগল, এ যেন দীর্ঘদিনের অভুক্ত এক হাতির খাওয়া দেখছে। প্রমা মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।

দীর্ঘ সময় ধরে খাওয়ার পর প্রমা রিয়াদকে বলল, ‘আমি একটু আসছি। সারপ্রাইজটা নিয়ে আসি। তুমি খাবার কমপ্লিট করে কিছুক্ষণ আমার জন্য অপেক্ষা করো।’ একটার পর একটা আইটেম সাবাড় করার দিকে মনোযোগ থাকার কারণে রিয়াদ কোনো জবাব দিল না। প্রমা কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, ভ্যানিটিব্যাগটাই বা সঙ্গে নিচ্ছে কেন, এসব প্রশ্ন মোটেই রিয়াদের মাথায় আসছে না। সে খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। সুযোগ বারবার আসে না।

টানা দেড় ঘণ্টাব্যাপী খাওয়ার পর রিয়াদের মনে হলো তার পেট আর কিছু নিতে চাচ্ছে না। একেবারে ভরপুর হয়ে গেছে। একবিন্দু পরিমাণ খালি জায়গাও যেন তার পেটে আর অবশিষ্ট নেই। প্রমা চলে যাওয়ার প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট পেরিয়েছে। এখনো তার আসার কোনো নাম নেই। রিয়াদ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। একটা ম্যাসেজ এসেছে। প্রমা পাঠিয়েছে। রিয়াদ ম্যাসেজটা পড়তে লাগল। প্রমা লিখেছে, ‘পার্কের ওই বেঞ্চিটাতে বসে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। বিল দিয়ে তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো। সারপ্রাইজটা কি, আশা করি বুঝে গেছ।’

ম্যাসেজ পড়ে শেষ করা মাত্রই রিয়াদের মাথা ঘুরতে শুরু করল। রিয়াদের মনে হলো, তার চারদিকের সবকিছুই যেন কেমন দুলছে। রিয়াদের মনে হচ্ছে, মাথা ঘুরে সে পড়ে যাচ্ছে। শেষমেশ প্রমা তাকে এতটা বোকা বানাবে রিয়াদ সেটা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। এপ্রিলফুল বলে যে কিছু একটা আছে, এমনটা রিয়াদের জানা থাকলেও মার্চফুল বলেও যে কিছু আছে এটা তার জানা ছিল না।

রিয়াদের এখনো ক্রমাগত মাথা ঘুরাচ্ছে। অজ্ঞান হব হব করেও সে অজ্ঞান হচ্ছে না। এরমধ্যে ওয়েটার এসে বিল দিয়ে গেছে। বিলের পরিমাণ দেখে রিয়াদের মাথা ঘুরানোর বেগটা আরও বেড়ে গেল। খাওয়াদাওয়ার পর গরম হয়ে আসা শরীরটা আবার হিমশীতল হতে শুরু করল।

বিল এসেছে ২২৭৮ টাকা। এতটাকা থাকা তো দূরের ব্যাপার, রিয়াদের পকেটে একটা দুই টাকারও নোট নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো তার পরনের পাঞ্জাবিতে আসলে কোনো পকেটই নেই। প্রমা সারাদিন এটা-সেটা আবদার করে টাকা খরচ করাতে পারে এই চিন্তায় রিয়াদ আজকে পকেটবিহীন পাঞ্জাবি পরে এসেছে। দেখতে রোমান্টিক মনে হলেও রিয়াদের পাঞ্জাবি পরে আসার পিছনের রহস্য এটাই।

দৌড় শুরু হওয়ার পূর্বে এথলেটরা হালকা হাত-পা নাড়াচাড়া করতে থাকে। এথলেটদের মতো রিয়াদও হালকা হাত-পা নাড়াচাড়া করতে লাগল। রিয়াদের পেটে গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে। অনেকটা বৈশাখ মাসের মেঘের শব্দের মতো। পরিস্থিতি পুরোটাই প্রতিকূলে। শরীরটাও ঠিকমতো সাপোর্ট দিচ্ছে না। যেকোনো সময়ে বৃষ্টি শুরু হতে পারে। রিয়াদ আশাহত হলো না। মোটিভেশনাল ভিডিও সে ভালোই দেখে।

হাত-পা নাড়াচাড়া করার মিনিট খানেক সময় গত হতেই রিয়াদ উসাইন বোল্টের গতিতে একটা ভোঁ-দৌড় দিল। রেস্টুরেন্টের ওয়েটার, ক্যাশিয়াররা কিছু বুঝে উঠার আগেই রিয়াদ দৌড়ে বিপজ্জনক এরিয়াটা পার হয়ে গেল। দৌড়াতে দৌড়াতে রিয়াদ বমি করতে শুরু করল। পেটপুরে খাওয়া পাস্তা, পিজ্জা, বার্গার একে একে সব বেরিয়ে যেতে শুরু করল। প্রমার দেওয়া উপলক্ষবিহীন সারপ্রাইজের এভাবে ষোলকলা পূর্ণ হলো।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট