স্থল সীমান্ত বিল ভারতের মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

আপডেট : ০৫ মে ২০১৫, ২৩:৪১

ভারতীয় মন্ত্রিসভায় বিল অনুমোদনের ফলে ৬৮ বছরের সীমান্ত সমস্যা এখন সমাধানের পথে ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ৫১ এবং বাংলাদেশের ভেতর ভারতের ১১১ ছিটমহল বিনিময় হবে অপদখলীয় জমির মধ্যে মেঘালয়, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে ২০০০ ও আসামের ২৬৮ একর পাবে বাংলাদেশ অচিহ্নিত সাড়ে ছয় কিমি সীমান্ত চিহ্নিত হবে। বৃহস্পতিবার বিলটি লোকসভায় পাস হতে পারে

শেষ পর্যন্ত আসামকে রেখেই বহুল আলোচিত বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল অনুমোদন করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য এই বিল আজ বুধবার ভারতের রাজ্যসভায় তোলা হচ্ছে। রাজ্যসভায় পাসের পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার লোকসভায় পাস করানোর কথা রয়েছে।
 
বিজেপি ও কংগ্রেসের মতৈক্যের ভিত্তিতেই পার্লামেন্টে বিলটি পাসের সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলা দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন অবসান হতে যাচ্ছে। পিটিআই, দ্য হিন্দু।
 
ভারতীয় পার্লামেন্টে সীমান্ত বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হবার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরসূচি চূড়ান্ত হবে। জুন মাসে নরেন্দ্র মোদী ঢাকা আসবেন বলে কূটনৈতিক সূত্র জানায়।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমলেই দুই দেশের সীমান্ত নিয়ে প্রায় সাত দশক ধরে চলে আসা সমস্যার সমাধান হচ্ছে। এক্ষেত্রে নতুন ইতিহাসের সূচনা করছেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে সীমান্তবর্তী দুই জনপদের মানুষের মধ্যে জমি, ভিটেবাড়ি নিয়ে জটিলতার সূচনা ঘটে, যার অবসান হতে চলছে।
 
গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সীমান্ত চুক্তি বিল নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি পার্লামেন্টে পাস হবে কিনা তা নিয়েও নানা জল্পনা-কল্পনা চলছিলো। এর কারণ ছিলো আসামকে চুক্তি থেকে বাদ রাখার সরকারি পরিকল্পনা। আসাম বিজেপির আপত্তির কারণেই আসামকে বাদ রেখে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল রাজ্যসভায় তুলতে চেয়েছিলো মোদী সরকার। কিন্তু আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ ও বিরোধীদল কংগ্রেসের আপত্তির মুখে সরকার এ সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। স্থল সীমান্ত চুক্তিতে আসামকে যুক্ত করেই সংবিধান সংশোধনী বিল ভারত সরকার অনুমোদন করেছে। গতকাল সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংবিধান সংশোধনী খসড়া বিল অনুমোদন করা হয়।
 
গত সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত চলা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকে আসামকে যুক্ত করেই পার্লামেন্টে স্থল সীমান্ত বিল উত্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ’র আহ্বানে বিজেপি নেতৃবৃন্দের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অমিত শাহ’র বাসভবনে অনুষ্ঠিত ঐ বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, সংসদীয় মন্ত্রী ভেংকাইয়া নাইডু, ক্রীড়ামন্ত্রী সোনওয়াল, বিজেপি’র সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবসহ আসাম বিজেপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
 
বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সাংবাদিকদের জানান, গত দুই দিন ধরে বিজেপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন লক্ষ্যে সংবিধান সংসদীয় বিল নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ’র প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠি ও বিরোধীদল কংগ্রেসের আপত্তির কথা তুলে ধরা হয়। এর পর গত কংগ্রেসের আমলে যেভাবে রাজ্যসভায় বিলটি উত্থাপন করা হয়েছে সেভাবেই পাসের জন্য উত্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আজ বুধবার সীমান্ত বিলটি অপরিবর্তিতভাবে রাজ্যসভা এবং কাল বৃহস্পতিবার লোকসভায় পাস হতে পারে। পার্লামেন্টে এই সংবিধান সংশোধন বিল পাসে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে। স্থল সীমান্ত সংক্রান্ত আগের একটি বিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ঝুলে আছে।
 
১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্থল সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ২০১১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে এ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মনমোহন চুক্তিটি সই করেন। কিন্তু এর বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন এখনো না হওয়ায় ব্যাপারটি ঝুলে রয়েছে।
 
দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময় এবং সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিত করাই এই স্থল সীমান্ত চুক্তির লক্ষ্য। সাড়ে ৬ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমানা চিহ্নিত করা হবে। ছিটমহলগুলোর মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি (৭১১০ একর জমি) এবং বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি (১৭১৬০ একর) জমি বিনিময় হবে। অপদখলীয় জমির মধ্যে মেঘালয়, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অধীন সীমান্তে ২০০০ একর জমি এবং আসামের ২৬৮ একর জমির অধিকারী হবে বাংলাদেশ।
 
চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সম্ভাব্য ঢাকা সফরের পালেও হাওয়া লেগেছে। কারণ নরেন্দ্র মোদী চাইছিলেন, এই বিল পাসের পর জুন মাসে বাংলাদেশ সফরে আসতে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ঢাকা ও নয়াদিল্লির কর্মকর্তারা মে মাসের শুরুতে ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধন বিল পাসের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফর দিনক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করার কথা।
 

মন্ত্রিসভায় বিলের অনুমোদনকে স্বাগত জানিয়েছেন সিপিআই এমপি ডি. রাজা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কংগ্রেস সরকারের আমলে স্থল সীমান্ত চুক্তি সংশোধনী বিল ভারতের উভয় সংসদে উত্থাপনের বিরোধিতা করলেও এখন তিনি তার মত পরিবর্তন করে এ বিল পাসের পক্ষে মত দিয়েছেন।