স্বপ্ন সবাই দেখে। দিন বদলের স্বপ্ন দেখেছিলেন আসাদুল্লাহ। ৩০ বছরের টগবগে যুবক। বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নে। দিনমজুরের কাজ করতেন তিনি। দিনে আয় করতেন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। একদিন এক দালাল তাকে বলেন, ‘কেন এতো কষ্ট করছেন। চাইলেই প্রতিদিন আয় করতে পারেন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। তাও মাত্র ২০ হাজার টাকা খরচ করে!’ এই প্রলোভনের ফাঁদে পা দেন আসাদুল্লাহ। এখন আছেন থাইল্যান্ডের কারাগারে। এই হতভাগ্যের স্ত্রী সাহিদা বেগম এমনটাই জানিয়েছেন।
শুধু আসাদুল্লাহ নয়। এমন করে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুপথে পা বাড়াচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। কক্সবাজার সদর ও উখিয়া উপজেলার প্রায় ৫ হাজার লোক নিখোঁজ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এসব লোক ভাগ্য বদলাতে গিয়ে হারিয়ে গেছেন থাইল্যান্ডের জঙ্গলের মতো কোথাও। হয়তো বা গভীর সাগরেই হয়েছে সলিল সমাধি। ইত্তেফাকের উখিয়া সংবাদদাতা রফিক উদ্দিন বাবুল জানান, শুধুমাত্র উখিয়া উপজেলায় ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার লোক নিখোঁজ রয়েছেন। তারা আদৌ ফিরবেন কিনা কেউ জানে না।
উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের তেলখোলা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, দিনটি ছিল ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। গ্রামের চৈপুচিং চাকমার ছেলে হে কুমার, কেউচিমেংর ছেলে ছপাইংগ্যা, পাংচিমেংর ছেলে কিনডু চাকমা ও মংচাইমেংর ছেলে মংতেছসহ ৫ জন প্রতিদিনের মত মনখালী উপকূলীয় এলাকায় পোনা ধরতে যায়। এসময় স্থানীয় পাচারকারীরা তাদের জোর করে নৌকায় তুলে দেয়। এদের বয়স ১৪ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে।
বয়োবৃদ্ধ ছৈপুচিং চাকমা জানান, তারা বর্তমানে থাইল্যান্ডের পুলচোয়ান কারাগারে বন্দী জীবন যাপন করছে বলে জানতে পেরেছি। পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় তাদের উদ্ধারের ব্যাপারে পরিবার এগুতে পারছে না। ছৈপুচিং চাকমা আরো জানান, এ ব্যাপারে মানব পাচারের উপর কর্মরত স্থানীয় এনজিও হেলপ্ কক্সবাজার কর্তৃপক্ষ বরাবরে একটি অভিযোগ করেছে। হেলপ্ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক এমএ কাশেম জানান, তাদের উদ্ধারের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
একই এনজিওতে অভিযোগ করতে আসা জালিয়াপালং ইউনিয়নের হাজেরা খাতুন জানান, তার ১৩ বছরের শিশু সন্তান এনামুল হককে অপহরণ করে মালয়েশিয়ায় পাচার করে দেয়া হয়েছে। প্রায় ৫ মাস অতিবাহিত হলেও ছেলের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
একইভাবে জালিয়াপালং ইউনিয়নের দীঘিরবিল গ্রামের রাজা মিয়া জানান, তার একমাত্র ছেলে খোরশেদ আলম ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে উপকূলীয় এলাকা থেকে অপহূত হয়। স্থানীয়রা বলছে, তাকে মালয়েশিয়া পাঠিয়ে দিয়েছে দালালরা।
বড় ইনানী গ্রামের আবুল মনসুর জানান, ডেইলপাড়া গ্রামের শামশু ওরফে লেইঙ্গার ছেলে দালাল শামশু আড়াই লক্ষ টাকার চুক্তিতে ৩০ হাজার টাকা নগদ নিয়ে তার ছেলে ইমরানকে মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে সাগর পথে পাচার করে দেয়। এখনও ছেলের কোন খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। এভাবে উপকূলীয় এলাকার মনখালী, চোয়াংখালী, ছেপটখালী, মাদারবনিয়া, রূপপতি, ইনানী, সোনাইছড়ি, জুম্মাপাড়া এলাকার প্রায় ৩ শতাধিক কিশোর, যুবক, ছাত্র নিখোঁজ হয়ে গেছে। অস্বচ্ছল এ পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের উদ্ধারে থানা বা আদালতের দ্বারস্থ পর্যন্ত হতে পারেনি।
স্থানীয়রা বলছে, উপকূলীয় এলাকায় অনেক দালাল রয়েছে। এসব দালাল মাত্র ২০ হাজার টাকার লোভে যে কোন বয়সের লোকজনকে জোর করে নৌকায় তুলে দেয়। একজনকে তুলে দিতে পারলে ২০ হাজার টাকা আয়ের লোভে দিন দিন দালালের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সাগর পথে পাচার হয়েছে অসংখ্য মানুষ।
এনজিও সংস্থা হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম এমএ জানান, গত ৩ বছরে উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে সাগরপথে পাচার হয়েছে জেলার ৫০ হাজার মানুষ। তন্মধ্যে এ পর্যন্তও নিখোঁজ রয়েছে প্রায় ৫ হাজার। কক্সবাজার প্রতিনিধি আহমেদ গিয়াস জানান, সদর উপজেলার প্রায় দেড় হাজার লোক তিন বছর ধরে নিখোঁজ।
এদিকে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে শঙ্খলা প্রদেশের জঙ্গল থেকে গত ৯ মে উদ্ধার হওয়া ১২৩ বাংলাদেশির মধ্যে কক্সবাজারের দুই কিশোর রয়েছে। এরা হল-কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামপুর নতুন অফিসপাড়ার ফরিদুল আলমের ছেলে দেলোয়ার হোসাইন ও নাজমুল হক নজুর ছেলে সেলিমুল হক রিফাত।
দেলোয়ার হোসেনের মা দিলফিরোজ বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে হঠাত্ করে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। কোথাও খোঁজ নেই। সম্ভাব্য সব জায়গায় তার সন্ধান চালিয়েছি। অবশেষে পত্রিকার লাল হরফে ছাপানো ছবিতে আমার ছেলে দেলোয়ারকে দেখে আতকে উঠি। ছেলেকে ফেরত পাওয়া ছাড়া এখন আমার কোন চাওয়া নেই।
উদ্ধার হওয়া অপর কিশোর সেলিমুল হক রিফাতের পিতা নাজমুল হক নজু বলেন, ‘এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে ছেলের সন্ধানে যাইনি। এখন পত্রিকার মাধ্যমে আমার ছেলে উদ্ধার হয়েছে বলে জেনেছি। আমার ছেলেকে ফিরে পাওয়া ছাড়া আর কোন দাবি নাই। এ জন্য সকলের সহযোগিতা চাই।
