মানবপাচার নিয়ে বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

ভুক্তভোগীদের বিক্রি করে দেয় থাই পুলিশ ও নৌবাহিনী

আপডেট : ১২ মে ২০১৫, ০৯:৩৫

বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার থেকে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া মানুষদের থাইল্যান্ডের পুলিশ এবং সরকারি কর্মকর্তারা সেখানকার পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সমুদ্রের মাঝপথে নৌকা থেকে উদ্ধার হওয়া হতভাগ্যদের বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অপরাধী সংগঠনের হাতে তুলে দেয়া হয়। আর এ অর্থের পুরো লেনদেন হয়েছে মালয়েশিয়া থেকে। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। পাচার হওয়া মানুষদের নিয়ে ব্যবসা করার কথা থাইল্যান্ড সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারাও জানেন। এ বিষয়ে থাই সরকার তদন্ত করছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

 
বিবিসির প্রতিবেদনে প্রকাশ, মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক মুসলিম রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। এখান থেকে তারা দালালের মাধ্যমে ছোট ছোট নৌকায় করে আন্দামান দ্বীপ হয়ে থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। এর সাথে অনেক বাংলাদেশিও যোগ দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, থাইল্যান্ডের কাছাকাছি সাগরে ওই দেশের নৌবাহিনী এবং পুলিশ বেশ কয়েকটি নৌকা আটক করতে সমর্থ হয়। পরে তাদেরকে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। দালালরা সেখান থেকে পাচার হওয়াদের মালয়েশিয়া উপকূলে নিয়ে যায়। এর মধ্যে পাচার হওয়া মানুষদের পরিবারের কাছ থেকে দালালরা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। 
 
আহমেদ নামের একজনের কথা উল্লেখ করে বিবিসি জানায়, মিয়ানমারের দাঙ্গার সময় আহমেদের নৌকা লুট করা হয়েছে। এরপর থেকে সেখানে সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলো। পরে সে আরো ৬০ জনসহ একটি কাঠের নৌকা করে থাইল্যান্ডে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। টানা ১৩ দিন আন্দামান সাগরে ভাসার পর তাদের নৌকাটি থাইল্যান্ডের উপকূলে গিয়ে পৌঁছে। এরপর বহনকারী নৌকাসহ তাদেরকে থাই নৌবাহিনী আটক করে। সেখান থেকে তাদেরকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে তাদেরকে একটি ঘরে গাদাগাদি করে শুইয়ে রাখা হয়। পরিদিন সকালে পুলিশের সহায়তায় দালালরা তাদের থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার সীমান্ত শহর সু নাগি কোলক-এ নিয়ে যায়। বিবিসিকে আহমেদ জানায়, সেখানে একটি গর্ত করে তাদের জন্য টয়লেট বানানো হয়। এর পাশেই তাদেরকে থাকতে দেয়া হয়েছে। বেশি খাবার খাইতে চাইলে তাকে লোহার চেইন দিয়ে মারা হতো। এর মধ্যে প্রতিদিনই পাচারকারীরা টাকার জন্য চাপ দিতো। আসহায় মানুষদের হাতে ফোন দিয়ে বলা হতো-আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধু বান্ধবদের ফোন দিতে। পাচারকারীরা থাই পুলিশকে যে অর্থ দিয়েছে তা মুুনাফাসহ ফেরত পেতে মরিয়া হয়ে উঠে।
 
আহমেদ জানায়, পাচারকারীরা তাকে জানিয়েছে, পুলিশের কাছ থেকে তাদেরকে অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছে। এ অর্থ না পেলে তারা তাদেরকে যেতে দেবে না, এমনকি তারা মারা গেলেও। আহমেদ আরো জানায়, পাচারকারীরা তাকে ৪০ হাজার থাই বাথ (১৩’শ ডলার) পরিশোধ করতে বললে সে বাড়িতে স্ত্রীর কাছে ফোন করে। টাকার জন্য বাড়িতে থাকা গরু বিক্রি করে দিতে বলে সে। পাচারকারীরা অর্থ পেয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। এরপর সে থাইল্যান্ডের পর্যটন এলাকা পুকেটে এসে পৌঁছলে আবার থাই পুলিশের হাতে আটক হয়। সেখান থেকে তাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। বিবিসির তথ্যমতে, থাইল্যান্ডের উপকূলে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। গত ২ জানুয়ারি সেখানে ৭৩ জন রোহিঙ্গা ধরা পড়ার পর তাদেরকে প্রথমে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সাগরের মাঝখানে তাদের আবার পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। বিবিসি এ নৌকার পাচারকারীদের সাথে কথা বলে জেনেছে, ৭৩ জন রোহিঙ্গাকে ১৫ লাখ বাথ বা ৫০ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এ অর্থের পুরোটাই এসেছে মালয়েশিয়া থেকে।
 

বিবিসি তাদের অনুসন্ধানী তথ্য নিয়ে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব শিয়াশাখ পুনেখতকেউ এর সাথে যোগাযোগ করেছে। তিনি জানিয়েছেন, এ ধরনের তথ্য তাদের কাছেও আছে। বিষয়টির তদন্ত করা হচ্ছে। তবে তিনি এ সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তা চেয়েছেন।