ব্লগার অনন্ত হত্যায় কেউ আটক হয়নি

আপডেট : ১৩ মে ২০১৫, ২৩:১৫

লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে (৩২) খুনের ঘটনায় জড়িত কেউ এখনো আটক হয়নি। এ ব্যাপারে নিহত অনন্তের বড় ভাই রত্নেশ্বর দাস বাদী হয়ে গত মঙ্গলবার রাতে সিলেট বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত চার জনকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকালে বিমানবন্দর থানার ওসি গৌসুল হোসেন জানান, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদঘাটন ও হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 
বিজ্ঞানমনষ্ক, যুক্তিবাদী লেখালেখির কারণে ধর্মান্ধ কোন গোষ্ঠী এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। ইতিপূর্বে যে কয়েকজন ব্লগার খুন হন, সেসব ঘটনার সঙ্গে অনন্ত হত্যার মিল পেয়েছে পুলিশ। এছাড়াও পারিবারিক, ব্যক্তিগত বা অন্য কোন কারণে অনন্ত খুন হয়েছেন কি-না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। অনন্তের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায়ও বলা হয়েছে, ‘লেখালেখির কারণেই ধর্মান্ধ কোন জঙ্গিগোষ্ঠী অনন্তকে খুন করে থাকতে পারে।’
 
অনন্ত হত্যার প্রতিবাদে ও খুনীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের আহবানে গতকাল সিলেট মহানগরীতে আধাবেলা হরতাল পালিত হয়েছে। শান্তিপূর্ণ হরতাল পালনশেষে গণজাগরণ মঞ্চ আগামীকাল শুক্রবার সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সংহতি সমাবেশ পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অনন্ত হত্যার প্রতিবাদে তার প্রতিবেশীরা গতকাল নগরীর সুবিদবাজারে মানববন্ধন করেছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও হয়েছে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, বিজ্ঞান সাময়িকী ‘যুক্তি’র সম্পাদক অনন্ত বিজয় দাস হত্যার বিচার দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়েছিলেন জনপ্রিয় লেখক, অধ্যাপক জাফর ইকবাল, অধ্যাপক ইয়াসমিন হকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা। এসময় অধ্যাপক জাফর ইকবাল বলেন, অনন্ত হত্যাকাণ্ডে আমাদেরকে ভয় পেলে চলবে না। আমাদের নিরাপত্তা আমাদের নিজেদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে। এসব হত্যাকাণ্ড বন্ধে সরকারের ব্যর্থতারও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। জাফর ইকবাল বলেন, যারা সত্য কথা বলে, তারা যেকোন সময় খুন হতে পারে। তাই বলে সত্য কথা উচ্চারণ করা বন্ধ করা যাবে না।
 
খুনীরা সিলেটী ভাষায় কথা বলে
 
মঙ্গলবারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন পাশের এক চা দোকানী, একজন সবজি বিক্রেতা ও আশপাশের বাসার দু’একজন মহিলা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী গতকাল ইত্তেফাককে জানান, খুনীরা নিজেদের মধ্যে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছে। অপারেশন শেষ করে তারা চলে যাওয়ার সময় বলেছে, কেউ ভয় পাবেন না। অন্য কারো কোন সমস্যা হবে না। আমাদের অপারেশন সাকসেস হয়েছে। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা দা, চাপাতি সাথে করেই নিয়ে যায়। এব্যাপারে অনন্ত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার ওসি (তদন্ত) নুরুল আলম বলেন, ঘাতকরা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছে বলে জানতে পেরেছি। আমাদের তদন্ত সেভাবে অগ্রসর হচ্ছে। ইতিমধ্যে একাধিক স্থানে আমরা অভিযানও চালিয়েছি। মামলার কিছু আলামত ও তথ্য-উপাত্ত অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।
 
খুনীরা আগেও বাসায় গিয়েছিল
 
অনন্তের বড় বোন পঞ্চতপা দাস বললেন, আমার ভাইয়ের কোন শত্রু নেই। এরপরও এমন নির্মমভাবে তাকে কারা মারলো তা আমরা জানি না। তবে তিনি জানান, গত বেশকিছুদিন ধরে কিছু লোক অনন্তকে নজরদারিতে রেখেছিল। কারণ কিছুদিন আগে অপরিচিত কয়েক যুবক অনন্তের কাছে টাকা পাওনা আছে বলে তাদের বাসায় এসেছিল। এসময় অনন্ত বাসায় ছিলেন না। তখন কিসের পাওনা টাকা একথা জানতে চেয়েছিলেন পঞ্চতপা। কিন্তু তারা কোন সদুত্তর না দিয়েই চলে যায়। এর কয়েক দিন পর আবার কয়েক যুবক এসে বাসা ভাড়া দেয়া হবে কি-না জানতে চায়। কিন্ু্ত তাদের বাসা ভাড়া দেয়া হবে এরকম কোন সাইনবোর্ডও কোথায়ও লাগানো ছিল না।
 
হত্যাকাণ্ডগুলো একইসূত্রে গাঁথা   
 
গতকাল সন্ধ্যায় সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (মিডিয়া) রহমত উল্লাহ বলেন, তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। অনন্তর যুক্তিনির্ভর লেখালেখির কারণেই কোন জঙ্গিগোষ্ঠী তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ঘটনাটি ঘটাতে পারে। হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে ইতিপূর্বে ঢাকায় ব্লগার অভিজিত্ রায়, ওয়াসিকুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সাথে সিলেটের এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে। একই গোষ্ঠীর কাজ হতে পারে এটি।
 
অনন্তকে ভিসা দেয়নি সুইডেন
 
বিবিসি জানায়, বাংলাদেশের ব্লগার ও লেখক অনন্ত দাশের সাম্প্রতিক ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করার কথা স্বীকার করেছে সুইডেন।
 
ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের হত্যার পর সুইডেন সরকার একটি বিবৃতিতে বলেছে তারা ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল, কিন্তু তিনি নিরাপত্তার কারণে সুইডেনে আশ্রয় চেয়ে কোনো আবেদন জানাননি। বিবৃতিতে সুইডেনের সরকার বলেছে তার হত্যার ঘটনা খুবই মর্মান্তিক।
 
সুইডিশ সরকার এই বিবৃতিতে বলেছে, অনন্ত আশ্রয়ের আবেদন জানালে তারা তা মূল্যায়ন করে দেখতেন।
 
সুইডেনে লেখকদের সংগঠন ‘পেন’ মঙ্গলবার তার হত্যাকাণ্ডের পর জানান, অনন্ত দাশের স্টকহোম যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন সুইডেন সরকার প্রত্যাখ্যান না করলে তিনি সেদিন বাংলাদেশের বদলে সুইডেনে থাকতেন।