এক মাস ধরে সাগরে ভেসে ছিল ওরা

আপডেট : ১৪ মে ২০১৫, ০০:৫০

ভাগ্যের চাকা বদলাতে সাগর পথে ‘স্বপ্নের দেশ’ মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে চেয়েছিল ওরা। কিন্তু ওদের সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সাগরের ভয়ংকর যাত্রায় ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ও পাচারকারীদের মারধর-নির্যাতনে শুধু প্রাণটাই বাঁচাতে পেরেছে; স্বপ্নটা আর পারেনি। দীর্ঘ এক মাস সাগরে ভেসে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে। ওরা সহ্য করেছে নির্মম নির্যাতন। ওরা দেখেছে, সঙ্গীদের লাশ কিভাবে চোখের সামনেই সাগরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে।

 
গত মঙ্গলবার বিকেলে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অদূরে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান অবস্থায় থাই ট্রলার থেকে ১১৬ অভিবাসন প্রত্যাশী যাত্রীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। গতকাল বুধবার ভোরে তাদের টেকনাফ কোস্টগার্ড কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক মাসের বিভীষিকাময় যাত্রার বর্ণনা দেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। উদ্ধার করা যাত্রীদের মধ্যে নরসিংদীর ১৪ জন, সিরাজগঞ্জের ১৬, কক্সবাজারের ১৫, বগুড়ার ৬, নারায়ণগঞ্জের ৫ ও বি-বাড়িয়ার ৪ জন রয়েছেন। এছাড়া বাকিরা দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। এদের মধ্যে কয়েকজন অসুস্থ বলে জানা গেছে।
 
টেকনাফ নোয়াখালী পাড়ার মো. ইয়াছিন (১৬) বলেন, ‘লেখাপড়ার খুব শখ ছিল কিন্তু আর্থিক অবস্থার কারণে সম্ভব হয়নি। ছোট ভাই রেদুয়ানের কপালে যেন তা না হয় সে জন্য মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিলাম। দালাল চক্র সাগরে নিয়ে যখন একটা জাহাজে তুললো, তখনই আমাদের স্বপ্নযাত্রা পরিণত হয় বিভীষিকার যাত্রায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের তত্ত্বাবধানে জাহাজে ছিল ১২০ জন লোক। উদ্ধার হওয়ার আগে এক মাসের বেশি সময় ধরে সাগরে ভেসে ছিলাম আমরা। এ সময়ে খুব সামান্যই খাবার ও পানি দেয়া হত। দিনে রোদে পুড়তে ও রাতে কনকনে ঠাণ্ডায় খালি গায়ে থাকতে বাধ্য করা হতো। এ কষ্ট সবার সহ্য হয়নি। কয়েকজন নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান। তখন তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেয়া হয়।’
 
এই ভুক্তভোগী আরও জানান, তাদের সঙ্গে ট্রলারে মিয়ানমারের কয়েকজন নারীও ছিল। সবাইকে প্রতিদিন নির্যাতন করা হতো। কারও কারও পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। থাইল্যান্ডের কথা বলে মিয়ানমার জলসীমায় ট্রলারটি রাখা হত। মিয়ানমারের দালাল চক্রের সদস্যরাও মাঝে-মধ্যে ট্রলারে উঠে মারধর-নির্যাতন করতো। এমনকি ট্রলারে থাকা নারীদের শ্লীলতাহানি করতো। এছাড়া ওইখানে আরও ৫টি বড় ট্রলার ছিল, প্রতি ট্রলারে কমপক্ষে ৩শ’ লোক ছিল বলে ইয়াছিনের ধারণা।
 
কক্সবাজার কলাতলী এলাকার নুরুল আলমের ছেলে দেলোয়ার বলেন, ‘দালাল চক্র প্রলোভন দেখিয়ে আমাকে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচার করেছিল। এই পথে এত কষ্ট আমি জানতাম না। দালাল আমাকে এইভাবে গাদাগাদি করে যাওয়ার কথা আগে বলেনি। আর এইভাবে নির্যাতন করবে তা আমার জানা ছিল না। এক মাস ধরে সাগরে ভাসমান অবস্থায় যেভাবে মানবেতর জীবনযাপন করেছি তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি প্রাণে বেঁচে যে দেশে ফিরে আসতে পারব তা বুঝতে পারি নাই।’ তিনি জানান, মঙ্গলবার সকালে মাঝসাগরে ট্রলারটি ভাসমান অবস্থায় রেখে মিয়ানমারের নারীদের নিয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়। পরে ভেসে ভেসে কিছু দূর আসার পর এক যাত্রী ট্রলারটি চালু করে সেন্ট মার্টিনের কাছে আসলে কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধার করে।
 
উদ্ধার হওয়া কক্সবাজারের বাসিন্দা আবুল কাশেমের দাবি, একই এলাকার মো. রফিক (১৯), মো. হাসেম (১৭) ও জাহাঙ্গীর আলম (১৮) তার সহপাঠি। তারা মাসখানেক আগে টেকনাফ ভ্রমণে যান। বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটা করার সময় হঠাত্ কয়েকজন তাদের জিম্মি করে নিয়ে যায়। পরে দালাল চক্র তাদের সমুদ্র পথে পাচার করে দেয়।
 
কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার কাজী ফরিদুজ্জামান জানান, মঙ্গলবার বিকালে স্থানীয় জেলেদের তথ্য মতে সেন্ট মার্টিন থেকে প্রায় সাত-আট নটিক্যাল মাইল পূর্ব-দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মৌলভীরশীল নামক এলাকা থেকে ওই ১১৬ যাত্রীসহ থাই ট্রলারটি আটক করা হয়। ট্রলারটি স্থানীয় শুল্ক বিভাগের গুদামে জমা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সেন্ট মার্টিন স্টেশন কমান্ডার ডিকশন চৌধুরী।
 
আরো ১১ যাত্রী উদ্ধার: মঙ্গলবার গভীর রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে ১১ জন যাত্রীকে উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবে এ সময় কোন দালাল চক্রের সদস্য আটক হয়নি। টেকনাফ ৪২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে.কর্নেল আবু জার আল জাহিদ জানান, রাতে সমুদ্র পথে মানব পাচারের গোপন সংবাদ পেয়ে বিজিবির সদস্যরা নাফ নদীর মোহনায় গোলারচর এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় মামুন মিয়া (২৬), মো. হেলাল মিয়া (২৭), নুরুল হোসেন প্রকাশ ভুট্টো (২৭), আমির রহমান (২৪), হায়দার আলী (২৭), মহিনউদ্দিন (১৭), জসিম উদ্দিন (২৯), মো. মামুন (২২), বাবুল মোল্লা (২৪), মো. রেজাউল (২৮) ও শামীম আহাম্মদকে (২২) আটক করা হয়। এরা সবাই সুনামগঞ্জ, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও মাদারীপুরের বাসিন্দা। আটক যাত্রীদের থানায় সোপর্দ করে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হবে বলে তিনি জানান।
 
বিজিবি’র দাবি আটক ব্যক্তিদের ভাষ্য মতে, ৫০ দিন পূর্বে কক্সবাজার হতে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশ্যে দালাল চক্র তাদেরকে টেকনাফে নিয়ে আসে। এর পর সমুদ্র পথে থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার নাম করে মিয়ানমার জলসীমানার কাছাকাছি একটি ফিশিং বোটে আটকে রাখে। সর্বশেষ মঙ্গলবার শাহপরীর দ্বীপের গোলারচর এলাকায় নামিয়ে দালালরা চলে গেলে বিজিবি তাদের আটক করে।
 

পাচারকারী আটক: বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, বুধবার সকালে উপজেলার দৌলতপুর বাজার থেকে মানব পাচারকারী সন্দেহে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। তার নাম কালু গাজী (৩০), সে দৌলতপুর গ্রামের আকব্বর আলীর ছেলে। বেলকুচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, কালু গাজীর বিরুদ্ধে মানব পাচারের একাধিক মামলা রয়েছে।