বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে, মানসম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিত্সক ও নার্সসহ ২৩জন স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন। এ হিসেবে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ২০১৩ সালে ব্রিটিশ চিকিত্সা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। ওই সাময়িকীতে দাবি করা হয় বাংলাদেশের প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে মাত্র তিন দশমিক তিন জন। এ অল্পসংখ্যক কর্মী নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি চিকিত্সা সেবা প্রদানকারী হাসপাতালগুলো কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কর্মী সংকটের কারণে একজনকে অতিরিক্ত সেবা দিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত সেবার বিনিময়ে সেবাদানকারী কর্মী সংগত কারণে ইচ্ছামাফিক বাড়তি অর্থ দাবি করছে।
মানসম্পন্ন সেবার সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল, ওষুধ ও চিকিত্সা সরঞ্জামের আন্তসম্পর্ক রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যাচাই-বাছাই করেই প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। রাজধানী কেন্দ্রিক হাসপাতালগুলোতে রয়েছে অত্যাধুনিক চিকিত্সা সরঞ্জামও। কিন্তু প্রশিক্ষিত জনবলের সংখ্যাটা দেশের সেবা প্রত্যাশী জনগণের চেয়ে অনেক কম। অন্যদিকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মক্ষেত্রে চিকিত্সকেরা নিয়মিত থাকেন না এমন অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এ নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনাও চলছে। সরকারি হাসপাতালে রোগীকে অনেক রোগের ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। সেখানে ভর্তি ফি, বেড ভাড়াও নামে মাত্র। অল্প খরচে করা যায় রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও। অপারেশনেরও তেমন খরচ নেই। শুধু কিছু সরঞ্জাম বাইরে থেকে কিনে দিতে হয়। কিন্তু তারপরও জনবল ও হাসপাতালের শয্যার চেয়ে অধিক পরিমাণ রোগী হওয়ায় অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় না। বাধ্য হয়ে তাদেরকে যেতে হয় বেসরকারি হাসপাতালে।
বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ফি, বেড ভাড়ার নামে মোটা অংকের টাকা নেওয়া হয়। আইসিইউ, সিসিইউতে থাকার খরচ সরকারি হাসপাতালের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকম বেশি। রোগীর কাছ থেকে গলাকাটা অর্থ আদায়ের জন্য প্রয়োজন না হলেও আইসিইউ ও সিসিইউতে রাখার অভিযোগ রয়েছে। রোগী সুস্থ হওয়ার পরও অতিরিক্ত কিছুদিন হাসপাতালে রেখে দেওয়া হয় বাড়তি বেড ভাড়া আদায়ের জন্য। ভর্তি রোগীর ফলোআপ দেখার জন্য যেখানে ক্লিনিক্যাল জাজমেন্ট যথেষ্ট সেখানে অধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া হয়। বেসরকারি হাসপাতালে রোগ পরীক্ষার খরচও মাত্রাতিরিক্ত বেশি।
চিকিত্সার খরচ বাড়ার প্রধান কারণ ওষুধ। রোগীকে ওষুধের পিছনেই সিংহভাগ ব্যয় করতে হয়। ওষুধ কোম্পানিগুলো বাজারে টিকে থাকার জন্য চিকিত্সক ও ফার্মাসিস্টদের ঘুষ হিসেবে উপহার, কমিশন, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ দেয়। ওষুধ কোম্পানিগুলো এ বিনিয়োগ নিজেদের পকেট থেকে করে না। তারা ওষুধ বিক্রির মাধ্যমে জনগণের পকেট কেটেই আদায় করে। উত্পাদনের মানে কোম্পানিভেদে রয়েছে তারতম্য। তবু দাম ঠিক করা হচ্ছে ইচ্ছেমতো। উত্পাদন খরচের তুলনায় ওষুধের দাম কয়েকগুণ বেশি নির্ধারণ করার অভিযোগ রয়েছে।
চিকিত্সা সেবা অন্যসব পেশার মতো পেশা নয়। এটি মানবসেবা। চিকিত্সকেরা যখন চিরসত্য কথাটি ভুলে যায় তখন তারা রোগীর কাছ থেকে অযথা মাত্রাতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। তেমনিভাবে বেসরকারি হাসপাতালের মালিকেরা মানুষের জীবনকে জিম্মি করে ব্যবসা শুরু করেছে। মানবসেবা যখন ব্যবসার কাছে পরাজিত হয় তখন তো চিকিত্সা ব্যয় বাড়বেই।
n লেখক:শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
