সিলেট অঞ্চলে অস্বাভাবিক হারে বজ্রপাতের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-আতংকের শেষ নেই। চরম উত্কণ্ঠায় দিন কাটছে মানুষের। গত এক মাসে সিলেট অঞ্চলে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোর রাতেও সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। আতঙ্কের মধ্যে নির্ঘুম রাত কেটেছে সাধারণ মানুষের।
এলাকার বয়স্করা জানিয়েছেন, আগের দিনে এ রকম ঘন ঘন বজ্রপাতের ঘটনা ঘটত না। বজ্রপাতে মৃত্যুর হারও এতো বেশি ছিল না। ভাটির মানুষের মধ্যে নয়া আতংকে নাম এখন বজ্রপাত। তারা বলেন, দিনের বেলায় বজ্রপাত হলে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, গত ৯ মে পর্যন্ত এক মাসে বজ্রপাতে সুনামগঞ্জ জেলায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ মে বজ্রপাতে সুনামগঞ্জ জেলায় ২ শতাধিক গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে। এমন ঘটনায় ভাটির জনপদের কৃষক-গৃহস্থরা রয়েছেন চরম আতঙ্কে। গত কয়েক দিনে সুনামগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪। আর সিলেট অঞ্চলে হিসাব করলে এ সংখ্যা ৩২।
সিলেট অঞ্চলে ঘন ঘন বজ্রপাতের কারণ অনুসন্ধানের করে প্রতিকারের উপায় বের করতে তথ্য সচিব মরতুজা আহমদ গবেষকদের আহ্বান জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউজে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট আয়োজিত সাংবাদিকদের এক কর্মশালায় তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন।
সিলেট আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, গত ২০ বছরে শুধু সিলেটেই ৭ হাজার ৪৪১ বার বজ্রপাত হয়েছে। আহত ও নিহতদের অধিকাংশই হাওর এলাকার কৃষক ও বাসিন্দা। গত বছর জুলাই মাসে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় তারাবির নামাজ পড়ার সময় মসজিদের ভেতরে বজ্রপাতে বেশ কয়েক জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশাখেও আষাঢ়ের মত বৃষ্টি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘটনা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করেন আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, আকাশে অনেক ধরনের বজ্রপাত হয়। সবগুলো আবার জমিন পর্যন্ত পৌঁছায় না। যে সকল অঞ্চলে উঁচু ভূমির পাশাপাশি নিচু সমতল ভূমি রয়েছে সেসব স্থানের নিচু সমতল ভূমিতে বজ্রপাত বেশি হয়। সিলেটে একদিকে অসংখ্য পাহাড় ও টিলা রয়েছে অন্যদিকে রয়েছে হাওর। এ কারণে হাওর এলাকায় বজ্রপাত বেশি হতে পারে। তিনি জানান, বজ্রপাতের ঘটনা খোলা আকাশের নিচেই বেশি ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবন নির্মাণেও এখন আর বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা রাখা হয় না। ব্রিটিশ আমলে বিভিন্ন স্থাপনায় বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা রাখা হতো। এখন এ দিকটা আর তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. মো. আকতারুল ইসলাম চৌধুরী বজ্রপাতের কারণ সম্পর্কে বলেন, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন বজ্রপাতের অন্যতম কারণ হতে পারে।
বজ্রপাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশ
বজ্রপাতের ভয়াবহতা ও প্রতিকারে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গবেষণার জন্য ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সার্ক মিটিওরোলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টার (এসএমআরসি) এর গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে বজ্রপাতের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়। কিন্তু বজ্রপাতে বছরে মাত্র দেড়শ’র মতো মানুষের মুত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ সংখ্যা আরো বেশি। তারা মনে করেন, এ সংখ্যা ৫শ’ থেকে ১ হাজার যা অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি।