দালালদের খপ্পরে পড়ে ট্রলারযোগে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়া সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার শতাধিক লোক নিখোঁজ রয়েছে। বাড়ি থেকে বের হবার কয়েকদিন পর মোবাইল ফোনে তাদের নির্যাতনের শব্দ শুনিয়ে মুক্তিপণ দাবি করেছিল সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। সন্তানের জীবন রক্ষার্থে বাড়িঘর ও জমি বিক্রি করে দালালদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছিল অনেক পরিবার। কিন্তু যারা মুক্তিপণ দিয়েছিল তাদের পরিবারও স্বজনদের খোঁজ পায়নি আর যারা দেয়নি তারাও পায়নি। এরই মধ্যে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে একের পর এক বন্দিদের হত্যা ও গণকবরে ফেলার খবর শুনে রীতিমতো মুষড়ে পড়েছে এসব পরিবার। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রীতিমতো আহাজারি শুরু হয়েছে স্বজনদের পরিণতির কথা ভেবে।
অনেককে ট্রলারে হত্যা করে লাশ সমুদ্র ফেলা হয়েছে বলে সংবাদ দেয়া হচ্ছে। তারপরেও মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তানেরা প্রিয়জনের ফেরার আশার প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে। অনেক পরিবার মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সবকিছু বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরেজমিনে বেলকুচি উপজেলা ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
বেলকুচি পৌরসভার ক্ষিদ্র মাটিয়া দক্ষিন পাড়া গ্রামের আব্দুস সালাম জানান, পরিবারকে না জানিয়ে তার ছোট ভাই শুকুর আলী গত বছরের ২১ ডিসেম্বর বাড়ী থেকে বের হয়। পরে জানা যায় একই গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে হাবিবুল্লার সাথে সে ট্রলারযোগে মালয়েশিয়ায় রওনা হয়েছে। এরপর থেকে তার আর খোঁজ নেই। তাচ্ছিল্যের সাথে হাবিবুল্লাহ জানিয়েছে, শুকুরকে দালালরা মারপিট করে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শুকুরের মা হামেলা বেওয়া বলেন, আমার ছাওয়ালডারে নাকি সাগরে ফেলে দিয়েছে ওরা। মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে না। ও অবশ্যই ফিরে আসবে। শুকুর আলীর স্ত্রী দুই শিশুসন্তান নিয়ে এখনও স্বামীর ফিরে আসার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন।
বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের আজুগড়া জামতৈল গ্রামের বেলাল হোসেন জানান, তার ছেলে আব্দুল হালিম পনের বছরের কিশোর। স্থানীয় দালাল ঠোটকাটা লতিফ বিভিন্ন প্রলোভনে তার ছেলেসহ একই গ্রামের খোকন, আমিরুল, ইসমাইল, রশিদ ও হাবিবকে বাড়ী থেকে নিয়ে যায়। তিনদিন পর অজ্ঞাত নম্বর থেকে একটি ফোন আসে। নিজেকে ‘টেকনাফের আলী’ পরিচয় দিয়ে সবার পরিবারের কাছে বিকাশে ২০ হাজার করে টাকা দাবী করে। অন্যথায় সবাইকে মেরে ফেলা হবে হুমকি দেয়। পরে সবাই ১০ হাজার করে টাকা দেন। এরপর থেকে দেড় বছর পার হলেও তাদের কোন খোঁজ নেই। দালালদের নামে মামলা করলেও তারা জামিনে বের হয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। খোকনের ভাই শুকুর আলী জানান, তার ভাই দুই ছেলে এক মেয়ে রেখে দেড় বছর যাবত নিখোঁজ রয়েছে। কোন সন্ধান নেই। লেখাপড়া ছেড়ে সাত বছরের ছেলে তাঁতে ললি কেটে মায়ের সংসারের হাল ধরেছে। মা অন্যের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করছেন। সাংবাদিকের উপস্থিতিতে বড় ছেলে ইয়ামিন কথা বলতে পারে না, বাবার কথা শুনে তার দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরছিল। ।
খোকনের মতো এখনো নিখোঁজ রয়েছে বেলকুচির আজুগড়া গ্রামের আবুল কালাম, আবুল বাসার, জাকারিয়া, বারপুর গ্রামের আরিফুল, রেজাউল, রমজান, টেয়াশিয়া গ্রামের শহিদুল, নিশিবয়রা গ্রামের তারেকসহ অনেকে। তবে ভাগ্যবান কেউ কেউ মুক্তিপণ দিয়ে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছে। অনেকে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের জেলখানায় বন্দী রয়েছে।
থাইল্যান্ডে ছয় মাস জেল খেটে দেশে ফেরা বেলকুচি পৌর এলাকার চালা গ্রামের ওমর সানি জানান, ১৫০ জনের ধারণক্ষমতার একটি ট্রলারে চার শতাধিক যুবক নিয়ে রওনা হওয়া ট্রলারে একজন পানির জন্য চিত্কার করায় গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। দুজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁদের সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। কিছু বললেই মারধর করা হতো। স্থানীয় নুরুল ইসলাম দালালের মাধ্যমে তাঁর গ্রুপের ২৬ জনকে পাঠানো হলেও অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, মানব পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক যুবক মালয়েশিয়ায় গিয়ে খুন ও নিখোঁজ রয়েছে এমন তথ্য ক্রমশ পাওয়া যাচ্ছে। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের মধ্যে উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের চাকফিরানী গ্রামের বাঁশতলা মার্কেট এলাকা সংলগ্ন নতুন পাড়ার ৪ যুবক মালয়েশিয়ায় গিয়ে খুন ও নিখোঁজ হয়েছে। স্বজনরা জানান, মানব পাচারকারীদের চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় তাঁরা দু’জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং দু’জন নিখোঁজ রয়েছে। নিহত ২ জন হচ্ছে বেলাল উদ্দীন (২৫) ও হাছান (২৬)। নিখোঁজ রয়েছে একই এলাকার বশির আহমদের পুত্র কামাল উদ্দীন (২৬) ও আহমদ কবিরের পুত্র মো: জকরিয়া (২৫)।