বারো জেলায় কালবৈশাখীতে নিহত ৮, আহত অর্ধশত

আপডেট : ২৫ মে ২০১৫, ০১:২৫

দেশের ১২ জেলায় গত শনিবার রাতে কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হেনেছে। এসময় দেয়াল ধসে ও ঘরের উপর গাছ চাপা পড়ে ৮ জন নিহত ও আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। হাজার হাজার বাড়িঘর ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। বিপুল সংখ্যক গাছপালা উপড়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক তারের উপর গাছ ভেঙ্গে পড়লে ও বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ায় অনেক জেলায় বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গতকাল রবিবারও কয়েকটি জেলায় বিদ্যুত্ ছিল না। ঝড়ে মৌসুমী ফল, ধান, পাটসহ বিভিন্ন শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর

 
রংপুর : শনিবার রাতে দু’ দফা কালবৈশাখী ঝড়ে দুই জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছে। আহতদের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গাছ চাপা পড়ে মহানগরীর সাতমাথা এলাকায় অটোরিকশায় বসে থাকা পীরগাছা উপজেলার তালুক উপাশু গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে ও মীরবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র আশরাফুল ইসলামের (১৩) মৃত্যু হয়েছে। এসময় তার বন্ধু চান মিয়ার ছেলে মোখলেস আহত হয়। এদিকে ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া ঘরের নিচে চাপা পড়ে কৈকুড়ি ইউনিয়নের মৃত ছফর উদ্দিনের স্ত্রী জয়বুন বেগমের (৬৫) মৃত্যু হয়েছে।
 
এদিকে, ঝড়ে রংপুরের পীরগঞ্জ, পীরগাছা, তারাগঞ্জ, কাউনিয়া, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও গঙ্গাচড়া উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা বিধ্বস্ত হয়েছে। ১২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান, আম, কলা, ভুট্টা, পাটসহ রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কয়েক হাজার গাছপালা উপড়ে গেছে। অপরদিকে ঝড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে যাওয়াসহ তার ছিঁড়ে যাওয়ায় বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কয়েকটি উপজেলায়।
 
রংপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদ আহাম্মদ জানান, জরুরি ভিত্তিতে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তালিকা হাতে পেলেই ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে। রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফা ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ১১৫ কিলোমিটার ও দ্বিতীয় দফা ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ১১১ কিলোমিটার।
 
নীলফামারী : জেলার ডিমলা, কিশোরীগঞ্জ, জলঢাকা ও সদর উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছ। বৈদ্যুতিক তারে গাছ উপড়ে পড়ায় গতকাল রবিবার দুপুর পর্যন্ত বিদ্যুত্হীন অবস্থায় থাকে গোটা জেলা। ডিমলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের দুুদিয়াপাড়া গ্রামের দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়া ছাড়াও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং অনেক গাছ উপড়ে পড়েছে বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী। জলঢাকা উপজেলার মীরগঞ্জ ইউনিয়নের বালারপুকুর ও তার আশপাশের কয়েকটি গ্রামে কয়েকশত কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালা উপড়ে পড়ে। নীলফামারী সদরের কচুকাটা, টুপামারী, রামনগর, পঞ্চপুকুর ও চড়াইখোলা এলাকার শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়।
 
জয়পুরহাট: কালবৈশাখী ঝড়ে দেয়াল চাপা পড়ে একজন নিহত ও কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছেন। নিহত জাহিদুল হোটেল শ্রমিক। তার বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। ঝড়ে জেলায় বিদ্যুত্ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। যা ঠিক হতে আরো ২-৩ দিন সময় লাগবে বলে বিদ্যুত্ অফিস সূত্রে জানা গেছে। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কালবৈশাখী ঝড়ে বহু বাড়িঘরের উপর গাছ পড়ে রয়েছে। কয়েক কোটি টাকার ফলদ ও বনজ বৃক্ষের ক্ষতি হয়েছে। শতাধিক বৈদ্যুতিক খুুঁটি উপড়ে পড়ায় জেলার বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এ দিকে ঝড়ে অন্তত: ৫ শতাধিক কাঁচা ও পাকা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে জেলার বিস্তৃর্ণ এলাকার পাকা বোরো ধান, পাটসহ অন্যান্য ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসক আব্দুর রহিম জানান, শনিবারের ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে মাঠে কাজ শুরু হয়েছে।
 
গাইবান্ধা: জেলার ৫ উপজেলায় অন্তত ৫ শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি সাধিত হয়েছে। শনিবার রাত ৯ টা থেকে রবিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত জেলায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ব্যাপক সংখ্যক গাছপালাও ভেঙ্গে পড়েছে। বিদ্যুত্ বিভাগ জানিয়েছে, বিভিন্নস্থানে ঝড়ে বিদ্যুতের তারের উপর গাছ ভেঙে পড়া এবং খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় জেলায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
 
স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর : কালবৈশাখী ঝড়ে দেয়াল ধসে ও গাছ চাপা পড়ে গর্ভবতী মহিলা ও নানা-নাতিসহ ৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। নিহতরা হচ্ছেন— ফুলবাড়ী উপজেলার খয়েরপুকুর গ্রামের মুকুল চন্দ্র রায়ের গর্ভবতী স্ত্রী মিতু রায় (২২), নবাবগঞ্জ উপজেলার হাতিশাল গ্রামের মৃত মোশারফ আলীর ছেলে সিরাজুল ইসলাম (৬০) ও তার নাতি সাব্বির (৮) এবং চিরিরবন্দর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামের সবেত আলীর স্ত্রী আলেয়া বেগম (৬৫)। 
 
ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি। ভেঙ্গে ও উপড়ে গেছে বিপুল সংখ্যক গাছ। বৈদুত্যিক খুঁটি ভেঙ্গে পড়ে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত শনিবার সারারাত শহর ছিল অন্ধকার। এছাড়াও মহাসড়কে গাছ ভেঙ্গে পড়ায় দিনাজপুর-ঢাকা মহাসড়কে যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। 
 
ঝড়ে লিচু ও আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।  দিনাজপুর জেলা প্রশাসক আহমদ শামীম আল রাজী জানান, নিহতদের পরিবারকে অর্থ সহায়তা দেয়া হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্য সামগ্রী প্রদান করা হবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ক্ষতির তালিকা নিরুপণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
 
চাটখিল ও সোনাইমুড়ি (নোয়াখালী) : নোয়াখালী জেলার চাটখিলে কালবৈশাখী ঝড়ে ৩০-৩৫ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ে ক্ষেতের কাঁচা শাক-সবজি, ফল-মূল, মৌসুমী ফসল আম, কাঁঠাল নষ্ট হয়েছে। গাছ-গাছাড়া ভেঙ্গে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। গাছের ডাল ভেঙ্গে বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে যাওয়ায় এবং ৫/৬টি জায়গায় পিলার উপড়ে পড়ায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ৩০/৩৫টি টিন এবং কাঁচা ঘর বিধস্ত হয়েছে।
 
সোনাতলা (বগুড়া) : ঝড়ে বিদ্যুত্ ব্যবস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ভেঙ্গে পড়েছে  ঘরবাড়ি।  সোনাতলা পল্লী বিদ্যুত্ অফিসের এজিএম জানান, ঝড়ে  ৪টি বিদ্যুতের খুঁটি, ৩টি ট্রান্সফরমার, ও ৪০-৫০টি মিটার ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া ২০-২৫টি স্পটে তার ছিঁড়ে গেছে। এসব মেরামত করতে কমপক্ষে ৫-৬ দিন সময় লাগতে পারে। এদিকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বহু গাছপালা ও কিছু ঘরবাড়ি ভেঙ্গে পড়েছে।
 
উখিয়া (কক্সবাজার) : কালবৈশাখীতে বেশ কয়েকটি বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে ও গাছ-পালা ভেঙ্গে পড়ায় প্রায় ৮ ঘণ্টা বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। 
 
লক্ষ্মীপুর: কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও ৫ শতাধিক গাছপালা ভেঙ্গে গেছে। আহত ৬ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পল্লী বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে  বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
 
চান্দিনা ও বুড়িচং (কুমিল্লা): দেবিদ্বারে চাপানগর গ্রামে কালবৈশাখী ঝড়ে ফাতেমা আক্তার (৫) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহত ফাতেমা একই উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের ইয়াছিন মিয়ার একমাত্র মেয়ে। আহতরা হলেন— নিহতের নানী আবুল কাশেমের স্ত্রী রহিমা বেগম (৫০) ও খালা হোসনেয়ারা বেগম।
 
দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়) : দেবীগঞ্জে শনিবার রাতে দফায় দফায় বৃষ্টিপাত, ঝড় ও শিলাবৃষ্টির আঘাতে মৌসুমী ফল আম, লিচু ও ধান, মরিচ, ভুট্টা ও পাটের  ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গাছপালা উপড়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় ও তার ছিঁড়ে যাওয়ায় প্রায় ১৫ ঘন্টা বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকে।
 
কেন্দুয়া (নেত্রকোনা): উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গত শনিবার রাতে কালবৈশাখী ঝড়ে ঘরবাড়ি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে উপজেলার রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়নের চাপুরী গ্রামের ফকির অটোরাইস মিল। এতে ওই মিলের প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।
 
এছাড়াও গোবিন্দগঞ্জ, ফুলবাড়ি, বিরামপুর, সুন্দরগঞ্জ, পীরগঞ্জ ও মুরাদনগর সংবাদদাতারা সংশ্লিষ্ট জেলার কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাঠিয়েছেন।