আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনো সংস্কার হয়নি

আপডেট : ২৫ মে ২০১৫, ০১:৩১

আজ ভয়াল ২৫ মে। ছয় বছর আগে ২০০৯ সালের ২৫ মে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট সর্বনাশা ‘আইলা’ আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে। মুহূর্তের মধ্যে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি উপজেলার উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি এসে নিমিষেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় নারী ও শিশুসহ কয়েক হাজার মানুষ, হাজার হাজার গবাদিপশু আর ঘরবাড়ি। ক্ষণিকের মধ্যে গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখো পরিবার। লাখ লাখ হেক্টর চিংড়ি আর ফসলের ক্ষেত তলিয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় উপকূল রক্ষা বাঁধ আর অসংখ্য ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

 

সর্বনাশা ‘আইলা’র আঘাতে শুধু সাতক্ষীরায় নিহত হয় ৭৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশু, আর আহত হয় দুই শতাধিক মানুষ। প্রলংয়করী আইলা আঘাত আনার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও আশাশুনির প্রতাপনগর এলাকায় মানুষের হাহাকার এতটুকু থামেনি। দু’মুঠো ভাতের জন্য জীবনের সঙ্গে রীতিমত লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। আইলার পর থেকে এসব এলাকায় সুপেয় পানি সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। আইলা কবলিত এ অঞ্চলের রাস্তাঘাট এখনও ঠিকমত মেরামত হয়নি। বিশাল এ জনপদে  খুবই কম সংখ্যক সাইক্লোন সেন্টার রয়েছে।

 
আইলা’র ভয়াবহতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নে বসবাসরত মানুষের চোখে মুখে এখনও ভয়ংকর সেই স্মৃতি। আইলায় চার কিঃমিঃ ব্যাপী পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ঠাকরুনতলা সড়কটি ধসে পড়ে। ধসে পড়ে গড়কুমারপুর রাস্তাটিও। আইলার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এ রাস্তা দু’টি এখনও মেরামত না হওয়ায় চাউলখালী গ্রাম ও কালিতলা গুচ্ছগ্রামের দু’শতাধিক পরিবার জনবিচ্ছিন্ন। নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। কৃষি ফসল ও চিংড়ি উত্পাদন বন্ধ থাকায় গোটা এলাকাজুড়ে কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই এলাকা ছেড়েছে।
 
আইলার ছয় বছর অতিবাহিত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধগুলোর এখনো সংস্কার হয়নি। সামান্য ঝড় কিম্বা বৃষ্টিতে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে এ জনপদের কয়েক লাখ মানুষকে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান জানান, বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানিসহ যে সব সমস্যা রয়েছে তা সমাধানের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নদী ভাঙ্গন বা বেড়িবাঁধগুলো স্থায়ীভাবে সংস্কার করার জন্য ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
 
মাহাঃ হুমায়ুন কবির, কয়রা (খুলনা)  থেকে জানান, আইলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় কয়রা। এরপর ছয়টি বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় লাখ লাখ মানুষ তাদের ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
 

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের পাউবোর বেড়িবাঁধের ওপর শত শত মানুষ সেই থেকে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে শত কষ্টের মধ্যে দিয়ে বেড়িবাঁধকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তারা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সহায় সম্পদ বলতে যা কিছু ছিল তার সবটুকু জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাছাড়া ঐ সময়কার নদীর প্রবল ভাঙনে শাকবাড়িয়া, কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। গাছপালা শূন্য কয়রা উপজেলার পরিবেশ এখনো সম্পূর্ণ ফিরে পায়নি তার পূর্বের রূপ। যে কারণে শুষ্ক মৌসুমে প্রচণ্ড দাপদাহে মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। লবণাক্ততার কারণে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে কৃষকরা আজো ঠিকমতো ফসল বুনতে পারছে না। তবে স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, আইলার পর থেকে এ বছরই বেশকিছু জমিতে ফসল উত্পাদন করতে সক্ষম হয়েছে কৃষকরা। তবে এখনও লবণাক্ততার গ্রাস থেকে  রেহাই পায়নি অনেক এলাকা।